মানবজীবনে তাকওয়ার অপরিহার্যতা
আবু মাহফুজ আব্দুস সালাম
মানবজীবনে তাকওয়ার অপরিহার্যতা
আবু মাহফুজ আব্দুস সালাম
তাকওয়া পরিচিতি :
শাব্দিক অর্থ : তাকওয়া আরবি শব্দ যার অর্থ হচ্ছে, অন্তরকে অপ্রীতিকর বস্তু থেকে সুরক্ষিত রাখা। [মুফরাদাতুল কুরআন]
আল্লামা রাগেব আসফাহানী রহ. বলেছেন, তাকওয়া হলো, কোন বস্তুকে তার ক্ষতিকর ও অনিষ্টকারী বস্তু থেকে রক্ষা করা। এ অর্থে আল্লাহ তাআলার বাণী, -“তিনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে রক্ষা করলেন।” [সুরা আদ দুখান : ৫৬]
অর্থাৎ এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঈমানদার বান্দাদেরকে তাদের ক্ষতিকর বস্তু (জাহান্নাম) থেকে রক্ষা করেছেন।’
আল কুরআনে তাকওয়া
তাকওয়া শব্দটি পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন-
১. ভয়-ভীতি। আল্লাহ তাআলার বাণী- “হে লোকসকল! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর।” [সুরা হজ্জ : ১]
১. ভয়-ভীতি। আল্লাহ তাআলার বাণী- “হে লোকসকল! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর।” [সুরা হজ্জ : ১]
২. ইবাদত।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “আমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তাই তোমরা আমারই ইবাদত কর।” [সুরা আন নাহ্ল : ২]
৩. অপরাধ বর্জন করা।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “এবং তোমরা আল্লাহর অবাধ্য হয়োনা। আশা করা যায়তোমরা সফল হবে।” [সুরা বাকারা : ১৮৭]
৪. আল্লাহর একত্ববাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “তারাই ঐসকল লোক। আল্লাহ যাদের অন্তরকে একত্ববাদ যাচায়ের লক্ষ্যে পরিক্ষা করেছেন।” [সুরা আল হুজুরাত : ৩]
৫. ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “নিশ্চয় এটিই হচ্ছে অন্তরের একনিষ্ঠতা।” [সুরা হজ্জ : ৩২]
শরিয়তের পরিভাষায় তাকওয়া
আল্লামা রাগেব আসফাহানী রহ. বলেছেন, তাকওয়ার শরয়ী অর্থ হলো : “যাবতীয় গোনাহ থেকে অন্তরকে রক্ষা করা। আর গোনাহ বর্জন সম্ভব হবে সকল সন্দেহজনক বস্তু পরিত্যাগের দ্বারা। এবং তা পূর্ণতা লাভের লক্ষ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈধ বস্তুও পরিহার করা।”
এ অর্থেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিস ঃ “হালালের বিষয়টি যেমনিভাবে মানুষের নিকট স্পষ্ট। ঠিক তদ্রƒপ হারামের বিষয়টিও মানুষের নিকট স্পষ্ট।” [সহিহ বুখারি : হা. ৫২]
এ অর্থেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিস ঃ “হালালের বিষয়টি যেমনিভাবে মানুষের নিকট স্পষ্ট। ঠিক তদ্রƒপ হারামের বিষয়টিও মানুষের নিকট স্পষ্ট।” [সহিহ বুখারি : হা. ৫২]
আল্লামা জুরজানি রহ.ও অনেক সুন্দর বলেছেন, ‘আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে তাকওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা। আর গোনাহের ক্ষেত্রে তাদ্বারা উদ্দেশ্য হলো যাবতীয় অন্যায় পরিত্যাগ ও তা থেকে দূরত্ব অবলম্বন করে চলা। [“আল মুফরাদাত”, আল আসফাহানী : পৃ. ৫৩০]
মুত্তাকিগণের পরিচয়
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিগণের পরিচয় উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন- “এই কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই, তা মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত স্বরূপ। (যাদের পরিচয় হলো) তারা পরকালে বিশ্বাসী, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং আমার দেয়া রিজিক থেকে ব্যয় করে। আর তারা আপনার ও আপনার পূর্ববর্তী অবতীর্ণ বিষয়ে বিশ্বাসী এবং আখেরাতের প্রতিও ঈমান আনে। (জেনে রাখবে) তারাই তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সৎপথ প্রাপ্ত এবং তাঁরাই সফল।” [আল বাকারা : ১-৫]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর পূর্ব-পশ্চিমে মুখ ফিরানোতে কোন কল্যাণ নেই। তবে কল্যাণ লাভকারী একমাত্র তারা যারা আল্লাহ তাআলা, পরকালে, ফেরেশতাগণ, আসমানী কিতাবসমূহ এবং নবীগণের প্রতি ঈমান এনেছে। আর তাঁরাই আল্লাহকে ভালবেসে নিকটাত্মীয়, অসহায়, গরীব, মুসাফির, অভাবি এবং দাসমুক্তিতে সম্পদ ব্যয় করে। আর নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত আদায় করে এবং নিজেদের অঙ্গিকার পূর্ণ করে, আর বিপদ ও কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে। (আল্লাহর নিকট) তারাই প্রকৃত সত্যবাদী এবং প্রকৃত খোদাভীরু।” [আল বাকারা : ১৭৭]
হাদিসে রাসুলে : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “কোন বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুত্তাকি হতে পারবে না। যতক্ষণ না সে সমস্যাযুক্ত বস্তুতে জড়িয়ে যাবার ভয়ে, সমস্যাহীন বস্তু পরিত্যাগ করে।” [জামে তিরমিযি : হা. ২৪৫১]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন- “তিন বস্তুর ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করা দরকার। এক. বংশ মর্যাদার ক্ষেত্রে। দুই. ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে। তিন. মান-মর্যাদার ক্ষেত্রে। [জামে তিরমিযি : হা. ৩৬৭১]
সালফে সালেহীনের (নেককার পূর্বসূরী) দৃষ্টিতে
১. আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর রা. এর নিকট একটি পত্র এল। যাতে লেখাছিল, ‘মুত্তাকিদের কিছু চিহ্ণ রয়েছে। যদ্বারা তাদেরকে চেনা যায়। এবং তাঁরা নিজেরাও তা উপলব্ধি করতে পারে। এক. বিপদে ধৈর্য ধারণ করা। দুই. তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকা। তিন. নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করা। চার. কুরআনী বিধানের সামনে নিজেকে পূর্ণরূপে সঁপে দেওয়া।’ [আদ দুররুল মানছুর ফিত তাফসিরিল মাছুর, সুয়ূতি : ১/৫৭]
২. ওমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. বলেছেন- ‘সারাদিন রোজা রাখা এবং সারারাত দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার নাম তাকওয়া নয়; বরং তাকওয়া হলো আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় পরিত্যাগ করা।’
৩. মায়মুন বিন মিহরান রহ. বলেছেন- ‘কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুত্তাকি হতে পারবে না। যতক্ষণ না সে নিজের ব্যাপারে নিজ পরশি থেকেও বেশি হিসেবী হয়। (অর্থাৎ) তার খাবার, তার পোষাক এবং তার পানীয় কোথা থেকে এল, বৈধ স্থান থেকে না অবৈধ স্থান থেকে? (সবকিছুর হিসেব কষে নেওয়া)।
৪. সাঈদ বিন মুসায়্যিব রহ. বলেছেন- মুত্তাকি ঐ ব্যক্তি যে গোনাহ হওয়া মাত্রই তাওবা করে। (এমনকি) গোনাহ না হলেও তাওবা করে।’
৫. আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী রহ. বলেছেন- ‘কোন ব্যক্তি মুত্তাকি হতে হলে তার মাঝে চারটি গুণের সমাবেশ ঘটতে হবে, তন্মধ্যে একটি হলো- অত্যধিক আল্লাহ অভিমুখী হওয়া। আর তা অর্জন হবে গোনাহ ছেড়ে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করার মাধ্যমে। কিংবা উদাসিনতা ছেড়ে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হওয়ার দ্বারা।’ [“আল ফাওয়াইদ”, ইবনুল কাইয়্যিম জাওযিয়াহ : পৃ. ৫৬-৫৮]
৬. ত্বল্ক বিন হাবীব রা. কে তাঁর ছাত্ররা অনুরোধ জানাল যে, আপনি অল্প কথায় আমাদের সামনে তাকওয়ার কিছু পরিচিতি তুলে ধরুণ।
তিনি বললেন- ‘তাকওয়া হলো, আল্লাহ তাআলার রহমতের আশায় তাঁর আনুগত্য করা। আর তাঁর শাস্তির ভয়ে তাঁর অবাধ্যতা পরিহার করা। [মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, ১১/২৩]
৭. সুফিয়ান ছাওরি রহ. বলেছেন- ‘সাহাবাগণকে মুত্তাকি নামে ভূষিত করার একমাত্র কারণ হলো, তারা এমন বিষয়ে ভয় করে চলতেন যা সাধারণত পরিহার করা হয় না।’ [আদ দুররুল মানছুর ফিত তাফসিরিল মাছুর, সুয়ূতি : ১/৫৮]
৮. আব্দুল্লাহ বিন মোবারক রহ. বলেছেন- ‘যদি কোন ব্যক্তি একশটি বস্তু পরিহার করে চলে। আর একটি মাত্র বস্তুর ক্ষেত্রে অবহেলা করে। তবে সে পরিপূর্ণ তাকওয়া লাভ করতে পারেনি। [প্রাগুক্ত : ১/৫৮]
তাকওয়া : গুরুত্ব ও ফজিলত
মানব জীবনে তাকওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ রাসুল সা. ও তাঁর হাতে গড়া সাহাবাগণ এবং যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয়বান্দাগণ তাকওয়ার যে দৃষ্টান্ত পেশ করে গিয়েছেন, তা এ বিষয়টির গুরুত্ব হাজারো গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এবং যা আমাদের আমলী জীবন সুসংগঠিত করার জন্য যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে। অথবা তার বাস্তব প্রয়োগ আমাদের জীবনে এসে গেলে আমাদের জীবনও হয়ে উঠবে তাঁদের জীবনের মত অনেক সুন্দর। আমরাও তাঁদের মত চির স্মরণীয় হয়ে থাকবো সবার হৃদয়ে, ঠিক যেমন রয়েছেন তাঁরা। তাই হাদিসের কিতাবগুলো অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে, প্রিয় নবী মোহাম্মদ সা. অসংখ্য হাদিসে তাঁর প্রিয় উম্মতকে এই অমূল্য সম্পদটি হাসিল করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। এবং কিছু জায়গায় জোর তাগীদ ও করেছেন। তন্মধ্য থেকে কিছু হাদিস পাঠকের সামনে তুলে ধরছি :
১. এক হাদিসে এসেছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধিক জান্নাতে প্রবেশকারী বক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বললেন, দুই ধরণের ব্যক্তি- এক. খোদাভীতি। দুই. সৎচরিত্রবান ব্যক্তি। [জামে তিরমিযি : হা. ৬১৬]
২.আবুযর গিফারি রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কিছু উপদেশ দানের অনুরোধ জানালে রাসুল সা. বললেন- আমি তোমাকে তাকওয়ার উপদেশ দিচ্ছি কেননা তা সকল ইবাদতের মূল।” [“আল মুজামুল কাবীর”, তাবারানী : ২/১৬৮]
৩. এক হাদিসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তুমি একমাত্র মুমিনকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে। আর তোমার খাবার যেন একমাত্র মুত্তাকি বান্দাই খায়।” [সুনানে আবু দাউদ : হা. ৪৮৩২]
৪. অপর হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা খোদাভীরু, ধনী, বিনয়ী বান্দাকে বেশি পছন্দ করেন।” [সহিহ মুসলিম : হা. ২৯৬৫]
৫. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, “যে ব্যক্তি সন্দেহপূর্ণ বস্তু এড়িয়ে চলবে, তার দীন-ধর্ম, মান-সম্মান সবই নিরাপদ থাকবে।” [সহিহ বুখারি : হা. ৫২]
অনুরূপ আমাদের নেকার ও মুত্তাকি পূর্বসূরী সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তবে তাবেয়িন সকলেই অত্যন্ত মূল্যবান বাণী উপহার দিয়ে গেছেন, যেগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাথেয় হিসেবে কাজ করবে এবং তাকওয়ার পথে আমাদেরকে প্রেরণা যোগাবে। পাঠকদের সুবিধার্থে সেসব বাণী থেকে কিছু উল্লেখ করছি :
১. মুয়াজ বিন জাবাল রা. বলেছেন, “কিয়ামতের দিন সকল মানুষকে একটি ময়দানে একত্রিত করা হবে। হঠাৎ একজন ঘোষক ঘোষণা করবেন, মুত্তাকিগণ কোথায়? এরপর তারা আল্লাহর পার্শ্বে একত্র হবে। এ সময় আল্লাহর মাঝে আর তাদের মাঝে কোন পর্দা বা আড়াল থাকবে না।” [তাফসিরু ইবনে কাছির : ১/১১৯]
২. কাতাদা রহ. বলেছেন- “আল্লাহ তাআলা জান্নাত সৃষ্টি করার পর জান্নাতকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন-
তুমি কি কিছু বলবে? জান্নাত উত্তর দিল, খোদাভীতি অর্জন কারীদের জন্য আমার পক্ষ থেকে মোবারকবাদ।” [“আদ দুররুল মানছুর ফিত তাফসিরিল মাছুর”, সুয়ুতি : ১/৫৯]
৩. আব্দুল্লাহ বিন আউফ রহ. এক ব্যক্তিকে বিদায় দেবার সময় বললেন, ‘তোমার জন্য আবশ্যক হলো, আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা। কারণ আল্লাহ ও মুত্তাকি বান্দার মাঝে কোন একাকিত্ব নেই।’ [‘আল ফাওয়াইদ’, ইবনুল কাইয়্যিম জাওযীয়াহ : পৃ. ১৩৫]
৪. যায়েদ বিন আসলাম রহ. বলতেন, যে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে, মানুষ নিজ থেকেই তাকে ভালবাসবে। যদিও তাকে তারা অপছন্দ করে। [প্রাগুক্ত]
তাকওয়ার সুফল
আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে মুত্তাকিগণকে ২৬টি সুসংবাদ দান করেছেন।
১. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সম্মান ও মর্যাদা লাভের সুসংবাদ।
এরশাদ হচ্ছে- “যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে তাঁদের জন্য রয়েছে বিশেষ সম্মানের সুসংবাদ।” [সুরা ইউনুস : ৬৩-৬৪]
১. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সম্মান ও মর্যাদা লাভের সুসংবাদ।
এরশাদ হচ্ছে- “যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে তাঁদের জন্য রয়েছে বিশেষ সম্মানের সুসংবাদ।” [সুরা ইউনুস : ৬৩-৬৪]
২. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলা বলেন- “নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য মুত্তাকিগণের সাথেই রয়েছে।” [সুরা আননাহল : ১২৭]
৩. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞালাভের সুসংবাদ ।
পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে, “যদি তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো, তবে তিনি তোমাদেরকে বিশেষ জ্ঞান দান করবেন।” [সুরা আনফাল : ২৯]
৪. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পাপমোচন ও মহাপ্রতিদানের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী, “আর যে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে। তিনি তার পাপ মোচন করেন এবং তাকে মহাপ্রতিদান দেন।” [সুরা তলাক : ৫]
৫. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে গুনাহ মাফের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “এবং তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সুরা আনফাল : ৬৯]
৬. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রতিটি কাজে সহযোগীতা লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “আর যে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে। তিনি তার কঠিন বিষয়কে সহজ করে দেন।” [সুরা তলাক : ৪]
৭. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সংকট হতে মুক্তি লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “আর যে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে। তিনি তাকে মুক্তির পথ বেড় করে দেন।” [সুরা তলাক : ২]
৮. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দুশ্চিন্তামুক্ত প্রশস্ত রিজিকের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “এবং তিনি তাকে অকল্পনীয় স্থান থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করেন।” [সুরা তালাক : ৩]
৯. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “অতঃপর আমি মুত্তাকিদেরকে মুক্তি দেই।” [সুরা মারয়াম : ৭২]
১০. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে উদ্দেশে সফলতা দানের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “নিশ্চয় সফলতা একমাত্র মুত্তাকিদের জন্য।” [সুরা নাবা : ৩১]
১১. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নেক কাজের যোগ্যতা এবং পবিত্র জীবন লাভের সুসংবাদ। আল্লাহ তাআলার বাণী- “আর সৎলোক তারা, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী……. এবং তারাই একমাত্র মুত্তাকি।” [সুরা বাকারা : ১৭৭]
১২. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সত্যবাদীতার সনদ লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “তারাই ঐসকল লোক যারা সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকি।” [সুরা বাকারা : ১৭৭]
১৩. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সম্মানের উচ্চ আসন লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে সম্মানিত হলেন মুত্তাকিরা।” [সুরা হুজুরাত : ১৩]
১৪. আল্লাহ তাআলার ভালবাসা লাভের সুুসংবাদ। আল্লাহ তাআলার বাণী- “নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদেরকে ভালবাসেন। [সুরা তাওবা : ৪]
১৫. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সফলতা লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় কর। অবশ্যই তোমরা সফল হবে।” [সুরা আলে ইমরান : ১৩০]
১৬. আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “কিন্তু একমাত্র তোমাদের তাকওয়াই তাঁর নিকট পৌঁছে। [সুরা হজ্জ : ৩৭]
১৭. আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে শ্রমের স্বীকৃতি লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধারণ করে। আর নিশ্চয় আল্লাহ সাৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।” [সুরা ইউসুফ : ৯০]
১৮. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আমল কবুলের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “আল্লাহ তাআলা একমাত্র মুত্তাকিদের আমলই কবুল করেন।” [সুরা মায়িদাহ : ২৭]
১৯. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অন্তরের পবিত্রতা লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “আর এটাই অন্তরের পবিত্রতা।” [সুরা হজ্জ : ৩২]
২০. আল্লাহর পক্ষ থেকে ইবাদতে পূর্ণতা লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “তোমরা আল্লাহ তাআলাকে পরিপূর্ণভাবে ভয় কর।” [সুরা আল ইমরান : ১০২]
২১. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে জান্নাত ও প্রস্রবণ লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “নিশ্চয় মুত্তাকিগণ জান্নাত ও প্রস্রবণের মাঝে থাকবে।” [সুরা আয যারিয়াত : ১৫]
২২. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিপদ-আপদ হতে মুক্তি লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “ নিশ্চয় মুত্তাকিরা থাকবে নিরাপদ স্থানে।” [সুরা আদ দুখান : ৫১]
২৩. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সকল সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে। তারা কিয়ামতের দিন সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করবে।” [সুরা বাকারা : ১১২]
২৪. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তি হতে নিরাপত্তা দানের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করেছে। তাদের কোন ভয় নেই আর তারা দুঃখিতও হবে না।” [সুরা আরাফ : ৩৫]
২৫. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অনুগত স্ত্রী লাভ করার সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “নিশ্চয় মুত্তাকিদের জন্য রয়েছে সফলতা, ঘন বাগান, আঙ্গুর এবং অল্পবয়স্কা কুমারী নারী।” [সুরা নাবা : ৩১-৩৩]
২৬. আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলার বাণী- “নিশ্চয় মুত্তাকিরা সর্বোচ্চ শক্তির অধিকারী বাদশাহের নিকটবর্তী নিরাপদ আসনে বাগান ও প্রস্রবণের মাঝে থাকবে।” [সুরা কমার : ৫৪-৫৫]
[“বাসায়িরু যাবিত তাময়ীঝ ফী লাতায়িফি কিতাবিল আযীয”, আলফায়রুযা আবাদী : ২/৩০১-৩০৩] রিসালাতুল মুসতারশিদীনের টীকা : পৃ. ১৪৯]
তাকওয়া কেমন হওয়া উচিত
১.আব্দুল্লাহ বিন শাখির রা. বলেন, রাসুল সা. নামাজে দাঁড়ালে তাঁর বুকের ভেতর ফুটন্ত গরম পানির পাতিলের মত গড়গড় শব্দ হতো।” [সুনানে আবু দাউদ : হা. ৮৯০]
২. আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা. বলেন, ‘রাসুল সা. গভীর রজনীতে নামাজে এত বেশি পরিমাণ সময় ব্যয় করতেন যে, তাঁর কদম মোবারক ফুলে যেত, রাসুল সা. আল্লাহ তাআলার দরবারে কেঁদে কেঁদে এই দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আপনার এমন ভীতি দান করুন, যা আমাদের ও আমাদের গোনাহের মাঝে অন্তরাল হয়। এবং এমন আনুগত্য দান করুন, যা আমাদেরকে জান্নাতে পৌঁছাতে সহায়ক হয়।” [জামে তিরমিযি : হা. ১২৬৮]
৩. আবু হুরায়রা রা. কে এক ব্যক্তি তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেসা করলো যে, এটা কী জিনিস? তিনি বললেন, তুমি কি কখনো কাঁটা বিছানো রাস্তায় চলেছো? সে বললো, হ্যাঁ। তিনি বললেন, কিভাবে চলেছো? সে বললো, যখনই কোন কাঁটা সামনে আসতো তখনই নিজেকে গুটিয়ে খুব সতর্ক হয়ে চলতাম। তিনি বললেন, এটাই হলো তাকওয়ার স্বরূপ। [আদদুররুল মানছুর ফিত তাফসীরি মাছুর, সুয়ুতী : ১/৫৭]
৪. একদা জিবরাঈল আ. আল্লাহর রাসুল সা. এর দরবারে ক্রন্দনরত অবস্থায় উপস্থিত হলেন । রাসুল সা. তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম সৃষ্টি করার পর থেকে আমার দু’চোখ শুকায় নি এ ভয়ে যে, না জানি আমি আল্লাহর নাফরমানি করে ফেলি।” [সুওয়ারুন মিন হায়াতিল আম্বিয়া ওয়াস সাহাবা ওয়াত তাবিয়িন”, মাহমুদ আল মিসরী : ১/১৩১]
৫. বর্ণিত আছে, দাউদ আ. কে লোকেরা প্রতিদিনই সেবা শশ্র“সার জন্য আসতো এ ভেবে যে, তিনি অসুস্থ। অথচ তা ছিল মুলত আল্লাহ তাআলাকে অধিক ভয় করার ফলাফল। [প্রাগুক্ত : ১/১৩১]
৬. ঈসা আ. যখন আল্লাহ তাআলার কথা স্মরণ করতেন। তখন তাঁর শরীর পুরো রক্তিম বর্ণ ধারণ করতো। [প্রাগুক্ত : পৃ. ১/১৩১]
তাকওয়া : কিছু শিক্ষণীয় ঘটনা
১. নবী করিম সা. বলেছেন, অতীত যুগে এক ব্যক্তি সীমাহীন পাপ কর্মে জড়িয়ে পড়ে। অবশেষে তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে সে তার সন্তানদেরকে ডেকে বললো, আমি যখন মারা যাবো, তখন তোমরা আমাকে আগুনে জ্বালিয়ে আমার পুড়া দেহকে পিষে তা বাতাসে উড়িয়ে দিবে। আল্লাহর শপথ! যদি তিনি আমাকে ধরতে পারেন তবে এমন শাস্তি আমাকে দিবেন, যা ইতিপূর্বে কাউকে দেননি। অতঃপর লোকটি মারা গেলে অসিয়ত মত সবই করা হলো। ওদিকে আল্লাহ তাআলা জমিনকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, তার (লোকটির) যে যে অংশ যেখানে যেখানে আছে আমার সামনে উপস্থিত করো। জমিন নির্দেশ মত তাকে উপস্থিত করলো। আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করলেন। কিসে তোমাকে এমন কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করলো? সে জবাব দিলো, আপনার ভয় হে প্রভু! এ জবাব শুনামাত্রই মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন।” [ফতহুলবারি : ৭/৩৩২, হা. ৩৪৮১]
২.একবার আব্দুল্লাহ বিন মোবারক রহ. শাম দেশে অবস্থানকালে এক ব্যক্তি থেকে নিজ প্রয়োজনে একটি কলম ধার নিলেন। কিন্তু লোকটিকে কলমটি ফেরত দিতে ভুলে গেলেন। অতঃপর যখন তিনি মারওয়ায় (মক্কায় অবস্থিত একটি পাহাড়) অবস্থান করছিলেন।
দেখতে পেলেন কলমটি তাঁর সাথেই রয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমি তৎক্ষণাৎ শামে ফিরে গেলাম এবং মালিককে কলমটি ফিরিয়ে দিলাম। [তারিখে বাগদাদ”, খতীব বাগদাদী : ১০/১৬৭]
৩. একদা ইমাম আবু হানিফা রহ. আপন কর্মচারীকে কিছু ত্র“টিযুক্ত কাপড় দিয়ে বিক্রয়ের জন্য পাঠালেন। সাথে বলে দিলেন যে, কাপড়গুলো বিক্রয়ের সময় যেন ত্র“টিও বর্ণনা করা হয়। কর্মচারী বাজারে গিয়ে কাপড় বিক্রয় করলো ঠিক, তবে দোষ বর্ণনা করতে ভুলে গেল। আর ক্রেতাও বিষয়টি জানলো না। অবশেষে এ কথা ইমাম সাহেব রহ. জানতে পেরে বিক্রিত মূল্য ৩০ হাজার দিরহাম সদ্কা করে দিলেন। এবং অসতর্কতার কারণে কর্মচারিকে বরখাস্ত করলেন। [“আল খায়রাতুল হিসান ফি মানাকিবিল ইমাম আবি হানিফাতা আন নুমান”, ইবনে হাজার, পৃ. ৪৩]
৪. একদিন ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবী রহ. কোন প্রয়োজনে একটি পাহাড়ের কোন একটি জায়গা খনন করছিলেন। হঠাৎ দিনার ভর্তি একটি কলশি বেড়িয়ে এলো, তাঁর স্ত্রীও তাঁর সাথে খনন কাজে সহযোগিতা করছিল। তৎক্ষণাৎ তিনি স্ত্রীকে বললেন, “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিয়ুন” এ দেখি মহাবিপদ। সাথে সাথে স্থানটি পূর্বের মত ভরাট করে দিলেন। আর স্ত্রীকে বললেন, হয়তো তার কোন মালিক আছে যাদেরকে আমরা চিনি না। তাই তুমি এমর্মে অঙ্গিকার বদ্ধ যে, ঘটনাটি কাউকে বলবে না। তাঁরা উভয়ই ছিলেন নেককার তাই শত দরিদ্রতা ও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এমন দামী জিনিস রেখে তাঁরা বাড়ি ফিরে গেলেন। [“শাযারাতুয যাহাব”, ইবনুল ইমাদ : ৫/৪০৬]
৫. শায়েখ মাহমুদ মিসরী বলেন, আমাদের উস্তাদগণ ঘটনা শোনাতেন যে, মিসর থেকে আগত জামিআ আযহারে পড়–য়া এক ছাত্র কোন এক শায়খের দরসে অংশগ্রহণ করতো। একসময় তার খরচের টাকা আসতে বিলম্ব হচ্ছিল। ফলে সে কিছু রুটি আর কয়েক লোকমা খাবারের খোঁজে শায়খের দরস ত্যাগ করে বাইরে বের হয়ে পড়লো। যাতে সামান্য কিছু পাথেয় সংগ্রহ হয়। সে পথ চলছিলো, হঠাৎ মনের অজান্তেই একটি সংকীর্ণ গলিতে প্রবেশ করল। এরপর দেখতে পেলো সেখানে একটি ঘরের দরজা উন্মুক্ত এবং ভিতরে বিপুল খাবার রয়েছে। তিনি সে খাবার নিয়ে মুখে দিতেই পরক্ষণে মনে হলো। আমি তো ইলম অর্জনের জন্য এসেছে। আর ইল্ম হলো আল্লাহর জ্যোতি। তাই মালিকের অনুমতি ছাড়া এ খাবার ভক্ষণ করা নিজের ওপর জুলুম বৈ নয়। কারণ আলো আর অন্ধকার একত্র হতে পারে না। অবশেষে সে ক্ষুধা নিয়েই শায়খের দরসে উপস্থিত হলো। দরস শেষ হওয়ার পর এক মহিলা এসে শায়খের সাথে কিছু কথা বললো, যা সম্পর্কে উপস্থিত কারোরই জ্ঞান ছিল না। অতঃপর শায়খ ছাত্রটিকে লক্ষ্য করে বললো, এই আল্লাহর বান্দা! তোমার কি বিবাহের আগ্রহ আছে? সে বললো হুজুর, আপনি কি আমার সাথে ঠাট্টা করছেন? আমি আজ তিনদিন যাবত ক্ষুধার্ত। আমার দ্বারা বিবাহ করা কীভাবে সম্ভব? শায়খ বললেন, আগন্তুক মহিলাটি আমাকে বললো, তার স্বামী ইন্তেকাল করেছে তবে সে মারা যাওয়ার সময় একটি কন্যা ও অঢেল ধন-সম্পদ রেখে গিয়েছে। এখন তিনি আপন মেয়েকে কোন এক সৎছেলের হাতে তুলে দিতে চান। যে তার মেয়েকে বিবাহ করে পুরো সংসার দেখা-শোনা করবে এবং সম্পদগুলোকে কাজে লাগাবে। একথা শোনে ছেলেটি বললো, তাহলে আমি রাজি। এরপর শায়খ ছাত্রসহ মহিলা ও উপস্থিত সবাইকে নিয়ে মহিলার বাড়িতে উপস্থিত হলেন। ঠিক সে বাড়িতে যেখানে গিয়ে ইতিপূর্বে ছেলেটি খাবার মুখে দিয়ে ছিলো। যখন খাবার উপস্থিত হলো তখন ছেলেটি কেঁদে দিলে শায়খ তাকে জিজ্ঞেস করল, বৎস! তুমি কাঁদছো কেন? আমরা! তোমাকে বাধ্য করলাম না তো?
সে বললো, না। আমি কাঁদছি আনন্দে, কারণ কয়েকদিন পূর্বে আমি ঠিক এই খাবারগুলোই গ্রহণের জন্যে এ বাড়িতে প্রবেশ করে ছিলাম যা আজ আমার সামনে উপস্থিত। তখন আমি খাবারগুলো একারণে পরিত্যাগ করি যে, এটি তো আমার জন্য বৈধ নয়। অবশেষে আমি তা গ্রহণ না করেই ফিরে আসি। আর এখন আল্লাহ সেই খাবারই সাথে আরো অনেক দামী জিনিষ (স্ত্রী) হালাল পন্থায় দান করলেন আলহামদুলিল্লাহ। [সুওয়ারুন মিন হায়তিল আম্বিয়া ওয়াস সাহাবা ওয়াত তাবেয়িন”, মাহমুদ আল মিসরী : ২/৪৯২]
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায় যে, তাকওয়া হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আপন বান্দাদের প্রতি এবং রাসুল সা. এর পক্ষ থেকে তাঁর সকল উম্মতের প্রতি একটি মূল্যবান নসিহত (উপদেশ)। এমনকি রাসুল সা. তাকওয়ার প্রতি এতই গুরুত্বারোপ করতেন যে, কোন অভিযানে কাউকে সেনাপতি বানালে তাকে নিজের খুব কাছে ডেকে এর উপদেশ দিতেন। এমনকি বিদায় হজ্জে জিলহজ্জের দশম তারিখের খুতবায় উপস্থিত লোকদেরকে তাকওয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন। এছাড়া যখনই সাহাবিদেরকে একাকী কিংবা বিশেষভাবে নিদৃষ্ট কাউকে নসিহত করতেন, তখনই তাকওয়ার উপদেশ দিতেন। এমনকি দোয়াও করতেন, “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট হিদায়াত, তাকওয়া, সুস্থতা এবং প্রাচুর্যতা কামনা করছি।” [সহিহ মুসলিম : হা. ২৭২১]
এমনিভাবে সাহাবাগণ, তাবেয়িন, তাবে তাবেয়িনসহ অতীত সকল ওলিগণের জীবনীতে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই। তারা নিজেরা তো তাকওয়ার প্রতি যতœবান ছিলেনই; এমন কি নিজেদের অধীনস্থদেরকেও তাকওয়ার উপদেশ দিতেন।
আবুযর রা. বলেন, একবার রাসুল সা. এ আয়াতটি পাঠ করলেন- “এবং যে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করবে তিনি তার উত্তরণের পথ বের করে দিবেন।” [সুরা তলাক : ২]
রাসুল সা. আরো বললেন, হে আবুযর! যদি দুনিয়ার সকল মানুষও এটিকে (তাকওয়াকে) অবলম্বন করে তবে তাদের সকলেরই পরিত্রাণের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। [সুনানে ইবনে মাজা : হা. ৪২২০]
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রকৃত মুত্তাকিবান্দা হিসেবে জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুণ। [আমিন]


No comments:
Post a Comment