Wednesday, 1 November 2017

সামাজিক জীবনে উম্মাতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্ব, দায়িত্ব-কর্তব্য, করনীয় ও বর্জনীয়

সামাজিক জীবনে উম্মাতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্ব, দায়িত্ব-কর্তব্য, করনীয় ও বর্জনীয়ঃ
আবু মাহ্ফুজ মুফতি আব্দুস সালাম ধোবাউড়া, ময়মনসিংহ *
সমাজ ও সামাজিক জীবনের পরিচিতিঃ
নিশ্চয়ই আমরা অবগত আছি যে, পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে মানুষ যখন মিলেমিষে বাস করে, তখন তাকে সমাজ বলেআর সমাজের রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা-পেশা ইত্যাদি মিলে হয় সামাজিক জীবন

দারসের আলোচ্য বিষয় / শিরোনামঃ
মসজিদ হচ্ছে ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্রভূমিতাই মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়কর মহাঐশীগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা আলে-ইমরানের ১০৪ ও ১১০ নং আয়াত দ্বয়ের আলোকে ‘‘ সামাজিক জীবনে উম্মাতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্ব, দায়িত্ব, কর্তব্য, পালনীয় ও বর্জনীয় ’’ বিষয়ে সংক্ষিপ্তাকারে কুরআন ও সহীহ্ হাদীছের আলোকে প্রমান ভিত্তিক আলোকপাত করার চেষ্টা করব ইনশা-আল্লাহ্

ভূমিকা / Introduction / مقدمة
মহান আল্লাহ তায়ালা এ ভূপৃষ্ঠের প্রতিটি জনপদে মানব জাতীর কল্যাণে যত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন তন্মধ্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম

কে সকল নবী-রাসূলগণের উপর শ্রেষ্ঠত্বের মহাগুণে গুনান্বিত ও বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন এবং তদ্বীয় উম্মাত তথা জাতী-গোষ্টি ও সম্প্রদায়কেও শ্রেষ্ঠত্বের আসনে স্বমর্যাদায় অলংকৃত করার সাথে সাথে কিছু মৌলিক দায়িত্ব, কর্তব্য, পালনীয় ও বর্জনীয় নিরূপন করে দিয়েছেনযারা এই মহৎকার্য একনিষ্ঠতা, একাগ্রতা ও আন্তরিকতার সাথে সম্পাদন ও আঞ্জাম দিবেন তাদেরকে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করার এবং এহেন দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও শৈথিল্যতা প্রদর্শনে তিরস্কৃত করার অঙ্গীকার দ্যার্থহীন কন্ঠে কুরআনে ঘোষণা করেছেন

দারসের উদ্দেশ্যঃ
সত্যিকার মুমিনগণ যাতে কুরআনের দিক-নির্দেশনা অনুপাতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আমর বিল মারূফ ও নাহি আনিল মুনকারের যথাযথ বাস্তবায়নের কার্যকরী ভুমিকা রাখাই দারসুল কুরআনের উদ্দেশ্য

দারসুল কুরআননের মূল পয়েন্ট সমূহঃ
১. সহীহ্ (বিশুদ্ধ) তিলাওয়াত / التلاوة الصحيحة
২. সরল (প্রাঞ্জল) অনুবাদ / الترجمة التسهيلة
৩. নাম করণ (নাম করণের কারণ)        / وجه التسمية
৪. অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক পটভূমি / شان نزول وأهمية نزولها فى موكب التاريخية
৫. দারসের আলোচ্য বিষয় / موضوع الدرس
৬. ব্যাখ্যা / নির্দেশনা / আনুসাঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয় / التشريحات / المعلومات المتقلة بالأيات
৭. শিক্ষা / উপকারিতা / الإستفادة من الدرس / الفائدة
৮. উপসংহার / যবণিকা / সমপনী / الخاتمة / الإختتامة / الإنتهاء

১. সহীহ্ (বিশুদ্ধ) তিলাওয়াত / التلاوة الصحيحة
قال الله تعالى : ﴿ وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَوْ آَمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ ﴾

২. সরল (প্রাঞ্জল) অনুবাদ / الترجمة التسهيلة
অর্থাৎ : আর তোমাদের মধ্যে এরূপ এক সম্প্রদায় হওয়া উচিত- যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং ভাল কাজের আদেশ করবে ও মন্দ কাজের নিষেধ করবে আর তারাই সুফল প্রাপ্ত হবেতোমরাই মানবমন্ডলীর জন্যে শ্রেষ্ঠতম সম্প্রদায়রূপে সমদ্ভূত হয়েছ, তোমরা ভাল কাজের আদেশ করবে ও মন্দ কাজের নিষেধ করবে এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন কর; আর যদি গ্রন্থপ্রাপ্তগণ বিশ্বাস স্থাপন করতো, তবে অবশ্যই তাদের জন্যে মঙ্গল হতো; তাদের মধ্যে কেউ কেউ তো মুমিন এবং তাদের অধিকাংশই দুষ্কার্যকারী’’। [সূরা আলে-ইমরান : ১০৪ ও ১১০]

৩. নাম করণ (নাম করণের কারণ) / وجه التسمية
সূরা আলে ইমরান’-এ একস্থানে ইমরানের বংশ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে বিধায় এই সূরার নাম করণ করা হয়েছে ‘‘ আলে-ইমরান’’ হিসেবে

৪. অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক পটভূমি / شان نزول وأهمية نزولها فى موكب التاريخية
আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম, নূহ, ইব্রাহীম (আ:) ও ইমরানের বংশধরদের সারা দুনিয়াবাসীর ওপর প্রাধান্য দিয়ে রিসালাতের জন্য বাছাই করেছেনসমাজ ও দেশ থেকে দূর্নীতি ও অনৈতিক কার্যকলাপ প্রতিরোধে বদর, ওহুদ যুদ্ধের পরবর্তীতে এবং নবম হিজরীতে এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়

৫. দারসের আলোচ্য বিষয় / موضوع الدرس
আয়াত দ্বয়ে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের জাতীয় ঐক্য ও তার সুফল এবং উম্মাতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্ব, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আলোকপাত করেছেনদারসের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ৪টিঅথবা আয়াত দ্বয়ে চারটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছেযথা :
১. তোমাদের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায় হওয়া উচিত, যারা মানবজাতিকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে
২. তোমরাই মানবমন্ডলীর জন্যে শ্রেষ্ঠতম সম্প্রদায়রূপে সমুদ্ভূত হয়েছ
৩. তোমরা মানবজাতীকে ভাল, কল্যাণ ও সৎ কাজের আদেশ দিবে / সদোপদেশ দিবে
৪. আর তোমরা মানবজাতীকে অন্যায়-অশ্লীল, খারাপ-মন্দ, গর্হিত, শরীয়ত ও সমাজ বিরোধী কাজে বাধা / নিষেধ করবে

৬. ব্যাখ্যা / নির্দেশনা / আনুসাঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয় / التشريحات / المعلومات المتقلة بالأيات
প্রথম নির্দেশঃ
ولتكن منكم أمة يدعون إلى الخير ‘‘ আর তোমাদের মধ্যে এরূপ এক সম্প্রদায় হওয়া উচিত- যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে’’যে সম্প্রদায় মানবজাতীকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে সে সম্প্রদায়ের দাওয়াতের পন্থা / পদ্ধতি ও দাওয়াতের মৌলিক কর্মসূচী হলো আত্মশুদ্ধিআর এ আত্মশুদ্ধিও জন্য প্রয়োজন চিন্তাগত পরিবর্তনশিক্ষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক জীবনে পরিশুদ্ধিতা আনয়নএজন্য আল-কুরআনে মহানবী (সা:)-এর দাওয়াতের সফল কর্মসূচী ঘোষনায় মহান আল্লাহ্ এরশাদ করেন :
قال الله تعالى : ﴿ هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آَيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ﴾ - {سورة الجمعة : 2}.
Heis the One who raised amidst the unlettered people a messenger from among themselves who recites to them His verses, and purifies them, and teaches them the Book and the wisdom, although they were in an open error before.
অর্থাৎ : তিনিই উম্মীদের (নিরক্ষর জাতির) মধ্যে তাদের একজনকে পাঠিয়েছেন রাসূলরূপে, যিনি তাদের নিকট আবৃত্তি করবেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং শিক্ষা দিবেন কিতাব ও হিকমত (সুন্নাত); যদিও ইতিপূর্বে তারা ছিল স্পষ্ট গোমরাহীতে’’ [সূরাতুল জুমআহ্ : ২]

এই আয়াতে নবী-রাসূল, নায়বে নবী আলেম-উলামা, ইমাম ও দায়ীদের মৌলিক চারটি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছেযথা :-
তিনি সেই সত্তা, যিনি উম্মী (নিরক্ষর) দের মাঝে এমন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি :
১. আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করবেন (আবৃত্তি করবেন, পাঠ করে শোনাবেন, তদানুযায়ী জীবন-যাপন করবেন ও করাবেন।)
২. আত্মা পরিশুদ্ধ করবেন (সমস্ত পাপাচার, অনাচার, দুরাচার ও গোনাহ থেকে।)
৩. তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দিবেন (কুরআন অনুযায়ী আদর্শ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে সচেষ্ট হবেন।)
৪. এবং তাদেরকে হিকমত (জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তি, প্রজ্ঞা, কৌশল ও প্রয়োগ রীতি) শিক্ষা দিবেন
এ দাওয়াতী কর্মসূচীর মাধ্যমেই আরবের বিচ্ছিন্ন, নিরক্ষরতা প্রধান, বর্বর, বেদুঈন জাতি, সোনালী যুগের স্বর্ণের মানুষে জান্নাত প্রাপ্তির সুসংবাদ এবং শিক্ষাকের মর্যাদাসহ রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন। [প্রমান : ড.আব্দুর রহমান আন্ওয়ারী : ইসলামী দাওয়াতের পদ্ধতি ও আধুনিক পেক্ষাপট ১৭ পৃঃ]।

দ্বিতীয় নির্দেশঃ
كنتم خير أمة أخرجت للناس ‘‘তোমরাই মানবজাতীর কল্যাণে শ্রেষ্ঠতম সম্প্রদায়রূপে সমুদ্ভূত হয়েছ’’ করুনাময় আল্লাহ্ তায়ালা শ্রেষ্ঠতম নবীর কারণে আমাদেরকে মানবজাতীর শ্রেষ্ঠতম সম্প্রদায়রূপে সমুদ্ভূত করেছেননি¤œ উম্মাতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্বের কিছু বিবরণ উল্লেখ করা হলো

শ্রেষ্ঠনবীর শ্রেষ্ঠত্বের ঝলকানি ও উম্মাতে মুহাম্মাদীর মর্যাদার চমকঃ
ক. হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা:) বলেছেন : আমি ঐ নিয়ামত প্রাপ্ত হয়েছি যা, আমার পূর্বে কাউকেই প্রদান করা হয়নিসাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন : ঐ নিয়ামতগুলো কি? রাসূল (সা:) বলেন :
৫. আমাকে প্রভাব (মুজিযা) দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে
৬. আমাকে পৃথিবীর চাবি প্রদান করা হয়েছে
৭. আমার নাম আহ্মাদ রাখা হয়েছে
৮. আমার জন্য মাটিকে পবিত্র করা হয়েছে
৯. আমার উম্মতকে সমস্ত উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্বে ভূষিত করা হয়েছে। [প্রমান : মুসনাদে আহমাদ, তাফসীরে ইবনে কাছীর ২/৪৮১-৪৮৮]।

খ. রাসূল (সা:) বলেছেন আমার উম্মতের মধ্য হতে ৭০ (সত্তর) হাজার লোক বিনা হিসাবে এবং বিনা আযাবে জান্নাতে যাবেযারা : هم الذين لايسترقون، ولا يتطيرون، ولا يكتون، وعلى ربهم يتوكلون
১. যারা ঝাড়-ফুঁক (গ্রহন ও প্রদান) করে না (তাবীজ ও কবজে বিশ্বাস, গ্রহন ও প্রদান করে না।)
২. যারা পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করে না (হস্তরেখা ও রাশিফলে বিশ্বাস করে না, ভাবী শুভাশুভের লক্ষণের উপর বিশ্বাস করে না, গণকের কথায় কর্ণপাত করে না, যাদু ও কুফুরি থেকে বিরত থাকে।)
৩. যারা শরীরে আগুন দিয়ে সেক / দাগ লাগিয়ে নেয় না ও দেয় না (সিঙ্গা লাগায় না।)
৪. যারা তাদের স্বীয় রবের উপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা করে। [প্রমান : শাইখ ড. ইবনে উছাইমীন : আল-ক্বাওলুল মুফিদ আলা কিতাবিত তাওহীদড. আব্দুর রহমান আস-সাদী : ফাতহুল মাজীদ আলা কিতাবিত তাহওহীদআল-ক্বাওলুস সাদীদতাওহীদের মর্মকথা ২৯-৩০ পৃ: দারুল আরাবিয়া, ঢাকা থেকে প্রকাশিততাফসীরে ইবনে কাছীর ২/৪৮১-৪৮৮]।

  গ. এ ছাড়াও উম্মাতে মুহাম্মাদীকে অসংখ্য ও অগনিত শ্রেষ্ঠত্বের গুণে গুণান্বিত করা হয়েছে

তৃতীয় নির্দেশঃ
শ্রেষ্ঠ উম্মতের মৌলিক দায়িত্ব সৎকাজের আদেশ দেয়াঃ
ক. الأمر بالمعروف -এর পরিচিতিঃ
সৎকাজের আদেশবলতে ইসলামী শরীয়তের যাবতীয় বিধি-বিধান, জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূল (সা:)-এর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করাযা হবে ইখলাছ / একনিষ্ঠার সাথে শুধূ মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যমুমিনদের কল্যাণ ও সমবেদনায় ইসলামের আনুগত্য করাকেই সৎকাজের আদেশ বলেআল-কুরআনের এ নির্দেশ দ্বারা বোঝা যায়, প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হলো পথভ্রষ্ঠ মানুষকে সৎ ও ন্যায়ের পথ দেখানো। [প্রমান : ড. শাইখ ইবনে উছাইমীন : রমযানের আসর ১৭১ পৃঃ]।

খ. الأمر بالمعروف -এর উপকারিতা / ফজিলত ও তাৎপর্যঃ
সৎকাজের উপকারিতা, ফজিলত-তাৎপর্য ও মাহাত্ম অপরিসীমতন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :
১. সৎকাজের আদেশের মাধ্যমে আল্লাহ্ তায়ালার আনুগত্য, নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন হয়
২. নবী-রাসূলগণের অনুসরণ, অনুকরণ ও সফল দায়ীর উন্নত গুণাবলী অর্জনে সহায়ক হয়
৩. মুমিনের ঈমানী ও নৈতিক দায়িত্বের বহি:প্রকাশ হয়
৪. পরকালিন চিরমুক্তি ও জান্নাতুল ফিরদাউস প্রাপ্তিতে সহায়ক হয়এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ তায়ালা এরশাদ করেন :
قال الله تعالى : ﴿ إِنَّ الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا خَالِدِينَ فِيهَا لَا يَبْغُونَ عَنْهَا حِوَلًا
Surely those who believed and did righteous deeds theirs are the Gardens of Firdaus as entertainment. Where they will live forever and will not wish to move from there.
অর্থাৎ : নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তাদের অভ্যর্থনার জন্যে আছে জান্নাতুল ফিরদাউসসেথায় তারা স্থায়ী হবে; এর পরিবর্তে তারা অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হওয়া কামনা করবে না’’ [সূরাতুল কাহাফ : ১০৭-১০৮]

গ. শ্রেষ্ঠ উম্মতের দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ
শ্রেষ্ঠ উম্মতের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিম্নরূপঃ
শ্রেষ্ঠ উম্মতের মধ্যে নিজেকে গণ্য করতে হলে সমাজের মানুষকে কল্যাণের পথে পরিচালনা করার জন্য ভালোকাজের প্রতিষ্ঠা ও মন্দ কাজের প্রতিরোধ করার দায়িত্ব পালন করতে হবে
সমাজের মানুষের কল্যাণে কুরআন-সুন্নাহ অনুসৃত নীতি ও আদর্শগুলো পালন করা সকল মুসলমানের জন্য ওয়াজিবকুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীছের নির্দেশিত নীতি ও আদশের ব্যাপারে যথাযথ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করলে জীবনে সফলতা অর্জন করা যাবে এবং শ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়া যাবে
মুসলমান হওয়ার জন্য ও উম্মাতে মুহাম্মাদী হওয়ার জন্য আমরা শ্রেষ্ঠ জাতিআল্লাহর প্রতি ঈমান, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা দেয়া শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের চাবিকাঠিঅতএব আমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার জন্য, সকল মানুষের জন্য মঙ্গল ও কল্যাণ সাধনে নিবেদিতপ্রাণ হতে হবেএছাড়াও শ্রেষ্ঠ উম্মতের মধ্যে নিজেকে শামিল করতে নিম্নোক্ত দায়িত্ব পালন করা :
   সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা। (كنتم خير أمة أخرجت للناس تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر)
   হিকমত, সদুপদেশ ও উত্তম কথার দ্বারা মানুষকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা
   যালিমকে বাধা দেওয়া এবং মজলুমকে সাহায্য করা। (أنصر أخاك ظالما أو مظلوما)
   আত্মীয়স্বজনের সাথে সম্প্রীতি ও সদ্ভাব বজায় রাখা। (وآت ذا القربى حقه)
   সমাজের মানুষের সাথে সহাবস্থান, সমঝোতা ও সুসম্পর্ক বজায় রাখা
   আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস রাখা
   উপযুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, অসহায় দুঃস্থ মানুসের সেবা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীছের নির্দেশিত নীতি আদর্শের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারলে আমরা শ্রেষ্ঠ উম্মাত হিসেবে নিজেদেরকে গণ্য করতে পারব ইনশাআল্লাহ

চতুর্থ নির্দেশঃ
শ্রেষ্ঠ উম্মতের মৌলিক দায়িত্ব অসৎকার্যককলাপ প্রতিরোধ করাঃ
৬/৪/১. النهى عن المنكر -এর পরিচিতিঃ
মানবমন্ডলীর কল্যাণার্থে তাদের দৈনন্দিন জীবনের ঈবাদত-বন্দেগী, আখলাক্ব-চরিত্র, লেন-দেন, মুআমালাত-মুআশারাত, শরীয়ত ও সমাজ বিরোধী কর্মকান্ড, পাপাচার, অনাচার, দুরাচার, নিষিদ্ধ-গর্হিত, ক্ষমার অযোগ্য-শাস্তি যোগ্য, অন্যায় ও অপরাধ মূলক কাজ থেকে মুমিনদের নিষেধ করাআল্লাহর হক্ব ও বান্দার হক্ব / অধিকার পূরণ করত; সকল প্রকার বিপদ-মুসীবত, ক্ষতি ও বিপর্যয় এবং শাস্তি থেকে জাতিকে বাচানোর জন্য ইত্যাবশ্যকীয়ভাবে নিষেধ করেইহাই হলো নাহি আনিল মুনকার। [প্রমান : ড. শাইখ ইবনে উছাইমীন : রমযানের আসর ১৭১ পৃঃ]।

৬/৪/২. النهى عن المنكر অসৎকাজে বাধা প্রদানে শৈতিল্যতা প্রদর্শনের ভয়াবহ পরিণতিঃ
  ১. অসৎকাজে বাধা প্রদানে শৈতিল্যতা প্রদর্শনের ভয়াবহ পরিণতি প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ তায়ালা এরশাদ করেন :
قال الله تعالى : ﴿وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى (124) قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنْتُ بَصِيرًا ◌ قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ آَيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنْسَى﴾. ◌
And whoever turns away from My message shall have a straitened life, and We shall raise him blind on the Day of Judgment!'. He will say, "My Lord, why did you raise me blind while I was sighted?". He will say, "Like this Our signs came to you and you had ignored them. And in the same way you will be ignored today.
অর্থাৎ : যে আমার স্মরণে বিমুখ তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে ক্বিয়ামতের দিন উত্থিত করবো অন্ধ অবস্থায়সে বলবে ঃ হে আমার প্রতিপালক! কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো ছিলাম চক্ষুষ্মানতিনি বলবেন ঃ এই রূপই আমার নিদর্শনাবলী তোমার নিকট এসেছিল; কিন্তু তুমি তা ভূলে গিয়েছিলে এবং সেভাবে আজ তুমিও বিস্মৃত হলে’’ [সূরা ত্বা-হা : ১২৪-১২৬।]

  ২. আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিততিনি বলেন, আমি রাসূরুল্লাহ্ (সা) কে বলতে শুনেছি : من رأى منكم منكرا فليغيره بيده، فإن لم يستطع فبلسانه، فإن لم يستطع فبقلبه، وذالك أضعف الإيمانতোমাদের কেউ যদি অন্যায় দেখে তাহলে তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ (পরিবর্তনের চেষ্টা) করবেনা পারলে জিহ্বা দিয়ে বিরোধিতা করবেতাও না পারলে অন্তর দিয়ে তা পরিবর্তনের চেষ্টা করবে এবং ঘৃণা করবেআর এটা দুর্বলতম ঈমান’ [মুসলিম, তিরমিযী]
 
  ৩. হুযাইফা (রা) থেকে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ্ (সা) এরশাদ করেন : والذى نفسى بيده لتأمرونّ بالمعروف ولتنهونّ عن المنكر أو ليوشكنّ الله أن يبعث عليكم عذابا من عنده ثم لتدعوته ولا يستجاب لكمআমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, যার হাতে আমার জীবন! তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবেঅন্যথায় শ্রীগ্রই তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব পতিত হবেঅতঃপর তোমরা (তা হতে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে) দুআ করতে থাকবে কিন্তু তোমাদের দুআ কবুল হবে না

  ৪. ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ্ (সা) এরশাদ করেন : لتأمرن بالمعروف ولتنهون عن المنكر ولتأخذن على يدالظالم ولتأطرنه على الحق أطراতোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে, মন্দ কাজের প্রতিরোধ করবে, জালেমের হাত স্তব্ধ করে দেবে এবং তাকে সত্যের দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাবে’ [আবু দাউদ, তিরমিযী এটাকে হাসান হাদীছ বলেছেন।]

  ৫. হযরত হুযাইফা (রা) কে কোনো ব্যক্তিকে জীবিত থাকা সত্ত্বেও মৃত আখ্যায়িত করার কারণসম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তিনি উত্তরে বলেন : الذى لا ينكر المنكر بيده ولا بلسانه ولا بقلبه فهوميتযে ব্যক্তি হাত, মুখ ও অন্তর দিয়ে অন্যায়-অসত্যের প্রতিরোধ করে নাসে হচ্ছে জীবিত হওয়া সত্ত্বেও মৃততিনি বলেন, ‘এমন যুগ আসবে যখন লোকের কাছে সৎকাজের আদেশকারী এবং অন্যায় কাজের প্রতিরোধকারী মুমিন অপেক্ষা মৃত গাধা অধিকতর প্রিয় হবেঅর্থাৎ তখন মৎকাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের প্রতিরোধকারী নিজেরাই মন্দ হবে। [ইসলামের সামাজিক আচরণ-হাসান আইউব, ৪৭৯-৪৯৯ পৃঃ।]

  ৬/৪/৩. الأمر بالمعروف এবং النهى عن المنكر -এর  যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে পয়োজন রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতাঅথবা যারা রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতার অধিকারী / রাষ্ট্র নায়ক হবেন তাদের দায়িত্ব নিম্নরূপঃ
قال الله تعالى : ﴿ الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآَتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ﴾.
They are) those when we give them power in the land, establish Salah, pay Zakah, bid the fair and forbid the Unfair, and with Allah lies the fate of all matters.
আমি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দিবে এবং সৎকাজের আদেশ করবে ও অসৎকার্য হতে নিষেধ করবে; সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারে’ [সূরাতুল হাজ্জ্ব : ৪১]

৬/৪/৪. সৎকাজের আদেশ দানকারী এবং অসৎকাজের প্রতিরোধকারীর শর্ত সমূহঃ
যিনি সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের প্রতিরোধ করবেন তাকে
১. বালেগ (প্রাপ্ত বয়স্ক) হতে হবেঃ বালেগ না হলে তার উপর এ কাজ ফরয হয় না
২. মুমিন ও মুসলিম হতে হবেঃ অসৎকাজের প্রতিরোধ হচ্ছে দ্বীনের সাহায্যদ্বীনের সাহায্য মুমিন ও মুসলিম ছাড়া হতে পারে না
৩. সামর্থবান হওয়াঃ হাদীছের মধ্যেই এ শর্তের উল্লেখ আছেএর অর্থ -এ নয় যে, অক্ষম ব্যক্তি সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের প্রতিরোধ করতে পারবে নাতাকে অন্তর দিয়ে হলে পরিবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহন ও ঘৃণা করতে হবে। [প্রমাণ : হাসান আইউব, ইসলামের সামাজিক আচরণ : ৪৮৬-৪৯১ পৃঃ]

৬/৪/৫. সৎকাজের আদেশ দানকারী এবং অসৎকাজের প্রতিরোধকারীর পর্যায়ভিত্তিক করণীয়ঃ
সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের প্রতিরোধের কতগুলো পর্যায় রয়েছেবিচক্ষণতার জন্য এ বিষয়গুলো জানা দরকার
১. বিষয়টি পরিচিতি করানোঃ ত্রুটি ও অণ্যায়কারীকে তার ত্রুটির বিষয়ে শরীয়তের হুকুম সম্পর্ক জানানো এবং অন্যায়কারীকে তার অন্যায় সম্পর্কে শরীয়তের হুকুম এবং করণীয় সম্পর্কে জানাতে হবেবহ লোক বহু বিষয়ে শরীয়তের হুকুম জানে নাযদি জানত তাহলে তারা তা করত না

২. ওয়াজ-নসীহত করা এবং সদুপদেশ দেয়াঃ অন্যায়ের প্রতিরোধকারী যদি জানেন যে, কেউ অন্যায় করছে, তাহলে তার উচিত হল. ঐ ব্যক্তিকে ওয়াজ-নসীহত করা, সদুপদেশ দেয়া, আল্লাহর ভয়, তাঁর শাস্তি, সাক্ষাত ও হিসাব-নিকাশের ভয় দেখানো এবং অন্যায় সম্পর্কে আল্লাহর হুঁশিয়ারী স্মরণ করিয়ে দেয়া

৩. মন্দ এবং কঠোর বাক্য উচ্চারণ করাঃ যখন নরম কথা দ্বারা অন্যায়ের প্রতিরোধ করা সম্ভব না হয় এবং অন্যায়কারীর অন্যায়ের উপর টিকে থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় কিংবা ওয়াজ-নসীহতকারীকে ঠাট্রা-বিদ্রোপ করা হয় তখনই কেবল মন্দ ও কঠোর বাক্য উচ্চরণ করা যেতে পারেযেমন ইব্রাহীম (আ:) নিজ সম্প্রদায়কে বলেছিলেন :  أفِّ لّكم ولما تعبدون من دون الله أفلا تعقلون ‘‘ উহ! তোমাদের এবং এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের উপাস্যদের জন্য আফসুসতোমরা কি বুঝ না?’’ (সূরা আম্বিয়া : ৬৭।) এখানে মন্দ কথা দ্বারা অশ্লীল বাক্য বিনিময় উদ্দেশ্য নয়বরং সাধারণ মন্দ কথা দ্বারা শাঁসিয়ে দেয়াযেমন, হে বোকা! ফাসেক! মূর্খ, বেকুফ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা

৪. হাত দিয়ে প্রতিরোধ করা ঃ এর উদাহরণ হল, অন্যায়ের উপায়-উপকরণ ভেঙ্গে দেয়া, মন্দ ফেলে দেয়া, প্রতিকৃতি ভেঙ্গে ফেলা এবং মসজিদ থেকে যার উপর গোসল ফরয তাকে বের করে দেয়া ইত্যাদি। [প্রমাণ : হাসান আইউব, ইসলামের সামাজিক আচরণ : ৪৯২-৪৯৩ পৃঃ]

৬/৪/৬. সৎকাজের আদেশকারী এবং অন্যায় কাজের প্রতিরোধকারীর গুণাবলী সমূহঃ
১. জ্ঞানী হওয়াঃ যিনি সৎকাজের আদেশ এবং অন্যায়ের প্রতিরোধ করবেন তাকে সৎকাজ ও অন্যায়ের হুকুম ও দলীল-প্রমাণ সম্পর্কে অবহিত হতে হবে এবং ঐ সম্পর্কে মতানৈক্য ও মতভেদ সম্পর্কেও ওাক্বিফহাল হতে হবেযে ব্যক্তি ইলম ছাড়া সৎকাজের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ কওে, সে সংশোধনের চাইতে কয়েকগুণ বেশী ক্ষতি করে

২. পরহেযগার (আল্লাহ্ভীরু) হওয়াঃ পরহেযগারী (আল্লাহ্ভীতি) মানুষকে জ্ঞান অনুযায়ী আমল করতে বাধ্য করেসৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের প্রতিরোধে কোন বাড়াবাড়ি, আত্ম প্রবঞ্চনা, আগ্রাসন ও বিনা কারণে কাউকে কষ্ট দেয়া থেকে বাঁচায় এবং আল্লাহর সীমানার ভিতর দাঁড় করায়

৩. সচ্চরিত্রবান হওয়াঃ এটা হল এ বিষয়ের ভিত্তিদুঃচরিত্রের লোক উপকারের চাইতে অপকার বেশী করেননেক চরিত্র ছাড়া পরহেযগারী ও সুক্ষ্মভাবে আল্লাহর সীমানায় দাঁড় করাতে পারবে নাতার সাথে কামনা-বাসনা এবং ক্রোধ দমনও জরুরীতা না হয়, সে নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবেরাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন : من أمربمعروفٍ فليكن أمره بمعروفٍযে নেক কাজের আদেশ করবে, তার আদেশ যেন নেক হয়’, (বায়হাক্বী)। [প্রমাণ : হাসান আইউব, ইসলামের সামাজিক আচরণ : ৪৯৪ পৃঃ]

৬/৪/৭. ফরয প্রতিরোধের শর্তাবলীঃ
যে অন্যায়ের প্রতিরোধ করা বাধ্যতামূলক ফরয তার শর্ত হচ্ছে ৪টিযথা :
প্রথম শর্ত : ছোট গুনাহ হোক বা বড় গুনাহ হোক, শরীয় যেটাকে হারাম করেছে, তারই প্রতিরোধ করতে হবেএটা জরুরী নয় যে, অন্যায়টি কবীরা গুনাহর পর্যায়ের হবেযেমন, রাস্তায় সতর খোলা, অমুহরিম মহিলার সাথে নির্জনে অবস্থান এবং অমুহরিম স্ত্রীলোকের প্রতি তাকিয়ে থাকা-এগুলো সগীরা গনাহ হলেও তার প্রতিরোধ করা ফরযকেননা, সকল গুনাহই উম্মাহর জন্য ধ্বংসাত্মক, দ্বীনের জন্য ক্ষতিকারক এবং কেয়ামতের দিন আল্লাহর আযাবের কারণ হবে

দ্বিতীয় শর্ত : অন্যায়টির অস্তিত্ব বর্তমান বিদ্যমান থাকা চাইযেমন কাউকে মদ পান করতে দেখা, স্ত্রীলোককে উত্তেজিত করা, ইচ্ছাকৃতভাবে ভীরজমানো, প্রকাশ্যে কাউকে অন্যায়ের ঘোষণা করতে দেখা বা অন্যায়ের সহযোগিতা ও সমর্থন করতে দেখা ইত্যাদিএমতাবস্থায় প্রতিরোধ করা ফরয

তৃতীয় শর্ত : অন্যায়কারীর পিছনে গোয়েন্দাগিরী ছাড়াই তার অন্যায়টি প্রকাশমান হতে হবেমুসলিম দেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ব্যতীত ব্যক্তিগত স্বার্থে গোয়েন্দগিরী করতে আল্লাহ তায়ালা নিষেধ করেছেন

চতুর্থ শর্ত : অন্যায়টি গবেষণা ও ইজতিহাদ ব্যতিরেকে জানা এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ব্যতীত পরিস্কার বাক্য দ্বারা বুঝার পর্যায়ের হতে হবেকিছু আলেমের দৃষ্টিতে যা অন্যায়, অন্য আলেমের দৃষ্টিতে যদি তা অন্যায় না হয়, তাহলে সে অন্যায়ের প্রতিরোধ করা ফরয নয়কেননা প্রত্যেকেরই উপযুক্ত দলীল-প্রমাণ আছেহ্যাঁ, যদি উপযুক্ত দলীল-প্রমাণ না থাকে, তখন সে অন্যায়ের প্রতিরোধ ফরযএটা হচ্ছে, মাওয়ারদী, গাজালী, ইবনুল জাওযী ও ইবনু হাম্বল প্রমুখের অভিমত। [প্রমাণ : হাসান আইউব, ইসলামের সামাজিক আচরণ : ৪৯৫-৪৯৬ পৃঃ]

৭. শিক্ষা / উপকারিতা / الإستفادة من الدرس / الفائدة
   الأمر بالمعروف এবং النهى عن المنكر ইসলামের অন্যতম একটি মৌলিক আবশ্যকীয় ফরয
   জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের পূর্বশর্ত হলো কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীছের আলোকে জীবন-যাপন ও সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা
   সফলতা, মঙ্গল ও কল্যাণের দিকে আহ্বান করার জন্য ব্যক্তি, দল ও সংঘ তৈরী করা
   উম্মাতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুপ্রমানিত
   মুমিনদের উত্তম গুণে গুণান্বিত হওয়া আবশ্যক
   ইসলামী বিধান প্রতিপালনে পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে
   ইসলামী বিধান প্রতিপালনের বিরোধিতা, অবহেলা, শৈথিল্যতা প্রদর্শনে তিরস্কার ও জবাবদিহীতার ব্যবস্থা রয়েছে

৮. Conciliation / উপসংহার / যবণিকা / সমপনী / الخاتمة / الإختتامة / الإنتهاء
নবী-রাসূল ও তাঁদের উত্তরসূরিদের প্রধান দায়িত্ব হলো, আল্লাহর দ্বীন কায়েম করাবর্তমানে যেহেতু কোনো নবী নেই বা নতুন নবী আসবেন না, সেহেতু এ অবস্থায় নবীর উত্তরসূরিদেরকে এ মহান দায়িত্ব পালন করতে হবেসেই সাথে আমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের ধারা অব্যহত ও বলবৎ রাখতে হলে জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের প্রতিরোধ করতে হবেসুতরাং পঠিতব্য আলোচ্য বিষয়ে গুরত্বশীল হওয়ার এবং আমল করার তাওফীক্ব দান করুন, আমীন

নির্ঘন্ট / সহায়ক গ্রন্থাবলী / গ্রন্থপঞ্জী / তথ্যসূত্রঃ
১. তাফসীরুল কুরআনুল আজীম, ইবনে কাছীর (র)দারুস সালাম, রিয়াদ সৌদী আরব কর্তৃক প্রকাশিত
২. তাফসীরুল কুরআনুল কারীম, প্রফেসর ড. মুজিবুর রহমান, দারুস সালাম, রিয়াদ সৌদী আরব কর্তৃক প্রকাশিত
৩. তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন ইংরেজি, ই-বুক সংগ্রহ সমগ্র
৪. তাফসীর তাফহীমুল কুরআন, আল্লামা মাওদূদী (র), ঢাকা, বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত
৫. আল-ক্বাওলুল মফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ, ড. শাইখ ইবনে উছাইমীন (র)দারুস সালাম, রিয়াদ সৌদী আরব কর্তৃক প্রকাশিত
৬. ফাতহুল মাজীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ, আব্দুর রহমান আস-সাদীদারুস সালাম, রিয়াদ সৌদী আরব কর্তৃক প্রকাশিত
৭. ইসলামের সামাজিক আচরণ, হাসান আইউব, আহসান পাবলিকেশন, ঢাকা কর্তৃত প্রকাশিত
৮. হাদীছের আলোকে মানবজীবন, মাও. এম কে ইউসুফ (র)
৯. তাওহীদের মর্মকথা, দারুল আরাবিয়া, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত

* পরিচিতিঃ শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ
১. ইল্মুল ক্বিরাত ওয়াত-তাজবীদ, ক্বওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড, ঢাকা
২. তাকমীল, ক্বওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড, ঢাকা
৩. আত-তাখাছ্ছুছ (বিশেষ যোগ্যতার্জন) ; আদব, ইফ্তা, তাফসীর, হাদীছ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত, উত্তরা, ঢাকা
৪. ডিপ্লোমা ইন-কম্পিউটার, মনোসফ্ট কম্পিউটার ট্রেনিং এন্ড রিসার্স সেন্টার, উত্তরা, ঢাকা
৫. ইমাম ও দায়ীদের শরয়ী প্রশিক্ষণ কোর্স, আন্তর্জাতিক ইসলামী ত্রাণ সংস্থা সৌদী কর্তৃক পরিচালিত, ঢাকা
৬. মুয়াল্লিম ও ইমাম প্রশিক্ষণ কোর্স, ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

স্থায়ী ঠিকানাঃ

গ্রাম : চন্দ্রকোনা {মাওলানাবাড়ী}, ডাকঃ ঘোষগাঁও বাজার, উপজেলা : ধোবাউড়া, জেলা : ময়মনসিংহ। 
দুরালাপনী : 01913 520 616, 01872 595 231 
E-mail:Abumahfujabdussalam@yahoo.com.  ‍
www.facebook.com/Mawlana Abdus Salam.

No comments:

Post a Comment