পরকালীন জীবনে মুক্তির উদ্দেশ্যে ;
আল্লাহ্ তা‘আলার হক বা অধিকার এবং বান্দার হক বা অধিকার বিনষ্টের অপরাধ থেকে মুক্তির উপায় ও করণীয়ঃ
মুফতি আব্দুস সালাম
بِسْمِ اللهِ
الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمْ
نَحْمَدُهُ
وَنُصَلِّى عَلَى رَسُوْلِهِ الْكَرِيْمِ – أَمَّا بَعْدُ!
আমি আমার জীবনের এই সময়ে এসে
মহান আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলার পক্ষ থেকে পাওয়া সকল নি‘য়ামত ও জ্ঞানের মাধ্যমে আমার যে বুঝ
বা অনুভূতি হয়েছে এই বুঝ বা অনুভূতি থেকেই এই পত্র লেখা।
ক. ‘আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলা তাঁর
বান্দাদের হক বা অধিকার বিনষ্টের সকল অপরাধ বা গুনাহ সমূহ আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলা ইচ্ছা
করলে সৎকর্ম ও তাওবাহ এর মাধ্যমে ক্ষমা করে দিতে পারেন। যেমন
আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলা
এরশাদ করেছেন :
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا
دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا
عَظِيمًا﴾
অর্থ : নি:সন্দেহে আল্লাহ্
তাকে ক্ষমা করেন না,
যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা
করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর
যে লোক আল্লাহ্ সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করল, সে যেন অপবাদ আরোপ করল’। [সূরা
নিসা : ৪৮]।
খ. আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলা ইচ্ছা
করলে সৎকর্ম ও তাওবাহ এর মাধ্যমে ক্ষমা করে দিতে পারেন। যেমন
আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলা
এরশাদ করেছেন :
﴿وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ
اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى
لِلذَّاكِرِينَ﴾
‘আর দিনের দুই প্রান্তেই সালাত ঠিক
রাখবে, এবং
রাতের প্রান্তভাগে পূর্ণ কাজ অবশ্যই পাপ দূর করে দেয়, যারা স¥রণ
রাখে তাদের জন্য এটি এক মহা স¥ারক। [সূরা
হুদ : ১১৪]।
কিন্তু আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলা তাঁর
প্রিয় বান্দাদের অপরাধ বা গুনাহ তথা (হক্কুন নাস) কখনোই ক্ষমা করেন না। যতক্ষণ
পর্যন্ত কোন বান্দা তার ভাইয়ের অপরাধ ক্ষমা না করেন। কেননা
আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলার
নিকট সকল বান্দাই অত্যন্ত প্রিয় এবং আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলা
বান্দাদের ভালবাসেন। বান্দাদেও কোন অপরাধ বিনষ্টের দরুন
ক্ষমা পাওয়ার তিনটি শর্ত রয়েছে। যথা :
(ক)
বান্দার হক বা অধিকার ফেরত দেওয়া।
(খ)
বান্দার নিকট ক্ষমা চাওয়া।
(গ)
আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলার
নিকট ক্ষমা চাওয়া।
আমাদের জীবনের চলার ক্ষেত্রে
আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামের অনুশাসন সম্পর্কে চর্চা করি না বা জানি না। আমরা
মুসলিম। আমরা বিশ্বাস করি এ জীবনের পরে
আখেরাতের একটি জীবন রয়েছে,
সেই জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতা নিভর করে এই জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতার উপর। আমরা
অনেক বন্ধু-বান্ধব ছোটকাল থেকে এ পর্যন্ত বেড়ে উঠেছি, একসাথে
চলা-চল করেছি, এতে
হয়তো বা একে অপরের হক বা অধিকার নষ্ট করেছি, একে অপরের আড়ালে গীবাহ্ তথা দোষ
চর্চা করেছি, পরনিন্দা
করেছি, জেনে
না জেনে, বুঝে না বুঝে, অনেক সময় শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে
অহেতুক বান্দার হক / অধিকার খর্ব করেছি। যা অনেক বড়
অপরাধতুল্য। আমি এখন উপলব্ধি করতে পারলাম যে, আপনার বা
আপনাদের অধিকার ও নষ্ট করায় অপরাধী হিসেবে পরিণত হয়েছি। তাই
আপনার বা আপনাদের নিকট ক্ষমা প্রার্থী। বান্দার
সাথে সংশ্লিষ্ট অপরাধসমূহের মধ্যে আমার হৃদয়ে যা কড়া নেড়েছে তা সংশোধনের নিয়তে এবং
পরকালীন জীবনের ভয়বহতা থেকে মুক্তির জন্য নিম্নে আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলার কুরআন
ও রাসূল (সা)-এর হাদীস থেকে কিছু আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করছি। যাতে
আমি ক্ষমা পেতে পারি।
আল-কুরআনের আয়াতঃ
ক. আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলা বলেছেন
:
﴿كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ
أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ
الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ﴾
অর্থ : প্রত্যেক প্রাণীকে
মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর তোমরা
কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে
দোযখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তার
কার্যসিদ্ধি ঘটবে। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য
কোন স¤পদ নয়’। [সূরা আল-ইমরান : ১৮৫]।
খ. আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলা বলেছেন
:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ
الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ
بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا
فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ﴾
অর্থ : ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অনেক
ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং
গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ
যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ
কি তার মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তূত: তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহ্কে
ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ আওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু’। [সূরা
হুজরাত : ১২]।
গ. আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলা বলেছেন
:
﴿وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ
مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا﴾
অর্থ : ‘যারা বিনা
অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের
বোঝা বহন করে’। [সূরা
আহযাব : ৫৮]।
রাসূল (সা)-এর হাদীসঃ
একবার রাসুল (সা) তাঁর পাশে
উপবিষ্ট সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) কে বললেন : ‘তোমরা কি জানো, গরীব কে?, সাহাবায়ে কিরাম
(রাঃ) বললেন : আমাদের মধ্যে তো গরীব তাদেরকে বলা হয়, যাদের কাছে ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা
নেই’। তখন
রাসুল (সা) বললেন : ‘প্রকৃত
পক্ষে আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে গরীব সে যে, কিয়ামতের দিন সালাত, যাকাত, সিয়াম, সবকিছু নিয়ে
উঠবে, কিন্তু
তার এ কর্মগুলো থাকবে যে,
সে দুনিয়াতে কারো সাথে মন্দ আচরন করেছে, কারো নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ
আত্মসাৎ করেছে, কাউকে
আঘাত করেছে, কাউকে
খুন করেছে ইত্যাদি, তাই
এর বিনিময়ে কিয়ামতের দিন তার কিছু নেকী একে দিবে, কিছু নেকী ওকে দিবে। এভাবে
দিতে দিতে বান্দার হক আদায়ের পূর্বে যদি তার নেকী শেষ হয়ে যায়, তাহলে এই
হকদারদের গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। এরপর তাকে
জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’। [সহীহ মুসলিম]।
আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলা বান্দা
হিসেবে আল্লাহর বান্দাদের ভালোবাসা এবং ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা এবং তাদের উপর
অনুগ্রহ করা ঈমানী ও নৈতিক দায়িত্ব। আমি আল্লাহর
নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি জীবনে সংঘটিত হওয়া অপরাধসমূহের। এবং
আপনার বা আপনাদের হক বা অধিকার নষ্টের সমস্ত অপরাধগুলি অনুগ্রহপূর্বক ক্ষমা করে
দিবেন। কেননা বান্দার হক বান্দা যখন ক্ষমা
করবেন তখন আল্লাহ্ সুব্হানাহু তা‘আলাও তার বান্দাকে ক্ষমা করে দিবেন।
সেই সাথে আমার পক্ষ থেকে কোন
প্রকার সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন হলে, পরকালীন সফলতা ও মুক্তির উদ্দেশ্যে
অবশ্যই সাহায্য করব ইনশা-আল্লাহ্। মহান আল্লাহ
সকলকে ক্ষমা করার তাওফীক দান, করুন, আমীন।
ক্ষমাপ্রার্থী
আপনার অপ্রিয় বন্ধু
০৫/০২/২০১৯ ইং

No comments:
Post a Comment