Wednesday, 11 December 2019

আদম ও হাওয়া (আঃ) দ্বয়ের তাওবাহ-ইস্তিগফার ; আমাদের শিক্ষা ও প্রয়োজনীয়তাঃ


আদম ও হাওয়া (আঃ) দ্বয়ের তাওবাহ-ইস্তিগফার ; 
আমাদের শিক্ষা ও প্রয়োজনীয়তাঃ
আব্দুস সালাম হুসাইন আলী


০১. ভূমিকাঃ
আল-হামদুলিল্লাহি রাব্বিল ‘আ-লামী-ন। ওয়াস সালাতু ওয়াস সালাম ‘আলা- সায়্যিদিল আম্বিয়াই ওয়াল মুরসালীন। ওয়া ‘আলা আ-লিহি ওয়া আসহা-বিহি আজমাঈন। আম্মা বা‘দ! পৃথিবীর মানুষ ভূল ও অপরাধ করবে এটাই স্বাভাবিক নীতিতে পরিণত হয়েছে। তবে সর্বোত্তম হলো ভূল ও অপরাধ হয়ে গেলে সাথে সাথে ক্ষমা চাওয়া, ভূল স্বীকার করা।

০২. নিম্নে পৃথিবীর সর্ব প্রথম মানব ও মানবী ‘আদম ও আদম ও হাওয়া (আঃ) দ্বয়ের তাওবাহ-ইস্তিগফার প্রসঙ্গে কুরআনের বাণী :
﴿قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾
‘তারা উভয়ে বলল, হে আমাদের রাব্ব! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি, আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি রহম না করেন তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ব [সূরা আ‘রাফ : ২৩]।

০৩. তাফসীর / ব্যাখ্যাঃ
৩/১. তাফসীর আহসানুল বায়ান :
তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার এ হল সেই বাক্যসমূহ, যা আদম (আঃ) বরকতময় মহান আল্লাহর কাছ থেকে শেখেনযেমন সূরা বাক্বারার ৩৭ নং আয়াতে এ কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। (উক্ত আয়াতের টীকা দ্রঃ) শয়তান আল্লাহর অবাধ্যতা করল এবং তারপর সে কেবল এর উপর অটলই থাকেনি, বরং এটাকে বৈধ ও সাব্যস্ত করার জন্য জ্ঞান ও অনুমানভিত্তিক দলীলসমূহ পেশ করতে লাগলফলে সে আল্লাহর সান্নিধ্য থেকে বিতাড়িত এবং চিরদিনকার জন্য অভিশপ্ত গণ্য হলপক্ষান্তরে আদম (আঃ) স্বীয় ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করার প্রতি যত্নবান হলেনফলে তিনি আল্লাহর রহমত ও তাঁর ক্ষমা লাভের যোগ্য গণ্য হলেনএইভাবে দু'টি পথের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে গেলশয়তানের পথের এবং আল্লাহওয়ালাদের পথেরওপাপ করে অহংকার প্রদর্শন করা, তার উপর অটল থাকা এবং তাকে সঠিক সাব্যস্ত করার জন্য দলীলাদির স্তূপ খাড়া করা ইত্যাদি হল শয়তানী পথআর পাপ করার পর অনুতাপে দগ্ধ হয়ে আল্লাহ-সমীপে নত হয়ে যাওয়া এবং তওবা ও ক্ষমা চাওয়ায় সচেষ্ট হওয়া ইত্যাদি হল আল্লাহর বান্দাদের পথ। হে আল্লাহ আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভূক্ত করুন। [তাফসীর আহসানুল বায়ান]।

৩/২. তাফসীর যাকারিয়া :
কাতাদা বলেন, তারা দুজন নিজেদের লজ্জাস্থান পরস্পর দেখতে পেত নাকিন্তু অপরাধের পর সেটা প্রকাশ হয়ে পড়লতখন আদম আলাইহিস সালাম বললেন, হে রব! যদি আমি তাওবা করি এবং ক্ষমা চাই তাহলে কি হবে আমাকে জানান? আল্লাহ বললেন, তাহলে আমি তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবোকিন্তু ইবলীস ক্ষমা চাইলো না, বরং সে অবকাশ চাইলফলে আল্লাহ প্রত্যেককে তার প্রার্থিত বিষয় দান করলেন[আত-তাফসীরুস সহীহ]

৩/৩. আয়াত সংশ্লিষ্ট কাহিনী ; এ কাহিনীটিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়ঃ
৩/৩/ক. লজ্জা মানুষের একটি প্রকৃতিগত ও স্বাভাবিক অনুভূতি
মানুষ নিজের শরীরের বিশেষ স্থানগুলোকে অন্যের সামনে উন্মুক্ত করার ব্যাপারে প্রকৃতিগতভাবে যে লজ্জা অনুভব করে সেটি ঐ স্বাভাবিক অনুভূতির প্রাথমিক প্রকাশকুরআন আমাদের জানায়, সভ্যতার ক্রমোন্নতির ফলে মানুষের মধ্যে কৃত্রিমভাবে এ লজ্জার সৃষ্টি হয়নি বা এটি বাইরের থেকে অর্জিত কোন জিনিসও নয়, যেমন শয়তানের কোন কোন সুচতুর শিষ্য ও অনুসারী অনুমান করে থাকে বরং জন্মের প্রথম দিন থেকেই এ প্রকৃতিগত গুণটি মানুষের মধ্যে রয়েছে

৩/৩/খ. নগ্নতা, অশ্লিলতা, বেহায়াপনা ও যৌনতার পথে পরিচালিত করা :
মানুষকে তার স্বভাবসূলভ সোজা-সরল পথ থেকে সরিয়ে দেবার জন্যে শয়তানের প্রথম কৌশলটি ছিল তার এ লজ্জার অনুভূতিতে আঘাত করা, উলংগতার পথ দিয়ে তার জন্যে নির্লজ্জতা ও অশ্লিলতার দরজা খুলে দেয়া এবং যৌন বিষয়ে তাকে খারাপ পথে পরিচালিত করাঅন্য কথায় বলা যায় , প্রতিপেক্ষের ওপর আক্রমণ চালাবার জন্যে তার যে, দুর্বলতম স্থানটিকে সে বেছে নিয়েছিল সেই ছিল তার জীবনের যৌন বিষয়ক দিক যে লজ্জাকে মানবীয় প্রকৃতির দুর্গরক্ষক হিসেবে মহান আল্লাহ নিযুক্ত করেছিলেন তারই ওপর এনেছে সে প্রথম আঘাতটি শয়তান ও তার শিষ্যবর্গের এ কর্মনীতি আজো অপরিবর্তিত রয়েছেমেয়েদেরকে উলংগ করে প্রকাশ্য বাজারে না দাঁড় করানো পর্যন্ত তাদের প্রগতির কোন কার্যক্রম শুরুই হতে পারে না

৩/৩/গ. অসৎকাজ করার প্রকাশ্য আহবানকে মানুষ খুব কমই গ্রহণ করে :
অসৎকাজ করার প্রকাশ্য আহবানকে মানুষ খুব কমই গ্রহণ করে, এটিও মানুষের স্বভাবসূলভ প্রবণতাসাধারণত তাকে নিজের জালে আবব্ধ করার জন্যে তাই প্রত্যেক অসৎকর্মের আহকায়ককে কল্যাণকামীর ছদ্মবেশে আসতে হয়

৩/৩/ঘ. মানুষের মধ্যে উচ্চতর বিলাশী জীবন লাভের আকাংখা :
মানুষের মধ্যে উচ্চতর বিষয়াবলী যেমন মানবিক পর্যায় থেকে উন্নতি করে উচ্চতর মার্গে পৌছার বা চিরন্তন জীবনলাভের স্বাভাবিক আকাংকা থাকে আর শয়তান তাকে ধোঁকা দেবার ক্ষেত্রে প্রথম সাফল্য অর্জন করে এ পথেইসে মানুষের এ আকাংখাটির কাছে আবেদন জানায়শয়তানের সবচেয়ে সফল অস্ত্র হচ্ছে , সে মানুষের সামনে তাকে উন্নতির উচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়ার এবং বর্তমান অবস্থা থেকে উন্নতর অবস্থায় পৌছিয়ে দেবার টোপ ফেলে, তারপর তাকে এমন পথের সন্ধান দেয় , যা তাকে নীচের দিকে টেনে নিয়ে যায়

৩/৩/ঙ. মানবীয় সাধারণ ধারণার খন্ডন :
সাধারণভাবে একথাটির প্রচলিত হয়ে গেছে যে, শয়তান প্রথমে হাওয়া (আ.)-কে তার প্রতারণা জালে আবদ্ধ করে, তারপর আদম (আ.)-কে জালে আটকাবার জন্যে তাকে ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহার করেকিন্তু কুরআন এ ধারণা খণ্ডন করেকুরআনের বক্তব্য হচ্ছে, শয়তান তাদের উভয়কেই ধোঁকা দেয় এবং তারা উভয়েই শয়তানের ধোঁকায় বিভ্রান্ত হয়আপাতদৃষ্টিতে এটা একটি মামুলী কথা বলে মনে হয়কিন্তু যারা জানেন, হযরত হওয়া সম্পর্কিত এ সাধারন্যে প্রচলিত বক্তব্যটি সারা দুনিয়ায় নারীর নৈতিক সামাজিক ও আইনগত মর্যাদা হ্রাস করার ক্ষেত্রে কত বড় ভূমিকা পালন করেছে একমাত্র তারাই কুরআনের এ বর্ণনার যথার্থ মূল্য ও মর্যাদা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন

৩/৩/চ. নিষিদ্ধবৃক্ষের ফল ও যৌক্তিকতা :
এরূপ ধারণা করার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই যে, নিষিদ্ধ গাছের এমন কোন বিশেষ গুণ ছিল, যে কারণে তার ফল মুখ দেবার সাথে সাথেই হযরত আদম ও হাওয়ার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে গিয়েছিলআসলে এটি কেবল আল্লাহর নাফরমানিরই ফলশ্রুতি ছিলআল্লাহ ইতিপূর্বে নিজের ব্যবস্থাপনায় তাদের লজ্জাস্থান আবৃত করেছিলেনতারা তাঁর নির্দেশ অমান্য করার সাথে সাথেই তিনি তাদের ওপর থেকে নিজের হেফাজত ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা তুলে নিয়েছিলেন, তাদের আবরণ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেনতারা যদি প্রয়োজন মনে করে তাহলে নিজেদের লজ্জাস্থান আবৃত করার ব্যবস্থা করুকএ কাজের দায়িত্ব তাদের নিজেদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছিলেনআর যদি তারা প্রয়োজন মনে না করে অথবা এ জন্যে প্রচেষ্টা না চালায় তাহলে তারা যেভাবেই বিচরণ করুক না কেন, তাতে আল্লাহর কিছু আসে যায় নাএভাবে যেন চিরকালের জন্যে এ সত্যটি প্রকাশ করে দেয়া হলো যে, মানুষ আল্লাহর নাফরমানী করলে একদিন না একদিন তার আবরণ উন্মুক্ত হয়ে যাবেই এবং মানুষের প্রতি আল্লাহর সাহায্য -সহযোগিতা ততদিন থাকবে যতদিন সে থাকবে আল্লাহর হুকুমের অনুগতআনুগত্যের সীমানার বাইরে পা রাখার সাথে সাথেই সে আল্লাহর সাহায্য লাভ করতে পারবে নাবরং তখন তাকে তার নিজের হাতেই সঁপে দেয়া হবেবিভিন্ন হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়টি বর্ণনা করেছেন এবংএ সম্পর্কে তিনি দোয়া করেছেন ‘‘"হে আল্লাহ! আমি তোমার রহমতের আশা করিকাজেই এক মুহুর্তের জন্যেও আমাকে আমার নিজের হাতে সোপর্দ করে দিয়ো না"

৩/৩/ছ. মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের বিরোধিতায় শয়তানের অবস্থান :
শয়তান একথা প্রমাণ করতে চাচ্ছিল যে, তার মোকাবিলায় মানুষকে যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে সে তার যোগ্য নয়কিন্তু প্রথম মোকাবিলায় সে পরিজিত হলোসন্দেহ নেই, এ মোকাবিলায় মানুষ তার রবের নির্দেশ মেনে চলার ব্যাপারে পূর্ণ সফলকাম হতে পারেনি এবং তার এ দুর্বলতাটিও প্রকাশ হয়ে পড়লো যে, তার পক্ষে নিজের প্রতিপক্ষের প্রতারণা জালে আবদ্ধ হয়ে তার আনুগত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া সম্ভবকিন্তু এ প্রথম মোকাবিলায় একথাও চূড়ান্ত ভাবে প্রমানিত হয়ে গেছে যে, মানুষ তার নৈতিক মর্যাদার দিক দিয়ে একটি উন্নত ও শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিপ্রথমত শয়তান নিজেই নিজের শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার ছিলআর মানুষ নিজে শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করেনি রবং শ্রেষ্ঠত্ব তাকে দান করা হয়েছে দ্বিতীয়ত শয়তান নির্জলা অহংকার ও আত্মাম্ভরিতার ভিত্তিতে স্বেচ্ছায় আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেঅন্যদিকে মানুষ স্বেচ্ছায় ও স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে আল্লাহর হুকুম অমান্য করেনিবরং শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে এতে প্রবৃত্ত হয়অসৎকাজের প্রকাশ্য আহবানে সে সাড়া দেয়নিবরং অসৎকাজের আহবায়ককে সৎকাজের আহবায়ক সেজে তার সামনে আসতে হয়েছিলসে নীচের দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়ে নীচের দিকে যায়নি বরং এ পথটি তাকে উপরের দিকে নিয়ে যাবে এ ধোকায় পড়ে সে নীচের দিকে যায়তৃতীয়ত শয়তানকে সতর্ক করার পর সে নিজের ভুল স্বীকার করে বন্দেগীর দিকে ফিরে আসার পরিবর্তে নাফরমানীর ওপর আরো বেশী অবিচল হয়ে যায়অন্যদিকে মানুষকে তার ভূলের ব্যাপারে সতর্ক করে দেবার পর সে শয়তানের মত বিদ্রোহ করেনি বরং নিজের ভূল বুঝতে পারার সাথে সাথেই লজ্জিত হয়ে পড়েনিজের ত্রুটি স্বীকার করে, বিদ্রোহ থেকে আনুগত্যের দিকে ফিরে আসে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে নিজের রবের রহমতের ছত্রছায়ায় আশ্রয় খুঁজতে থাকে

৩/৩/জ. মানবপথ ও শয়তানের পথ সম্পূর্ণ ভিন্ন :
এভাবে শয়তানের পথ ও মানুষের উপযোগী পথ দুটি পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়আল্লাহর বন্দেগী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাঁর মোকাবিলায় বিদ্রোহের ঝাণ্ডা বুলন্দ করা , সতর্ক করে দেয়া সত্ত্বেও সগর্বে নিজের বিদ্রোহাত্মক কর্মপদ্ধতির ওপর অটল হয়ে থাকা এবং যারা আল্লাহর আনুগত্যের পথে চলে তাদেরকেও বিভ্রান্ত ও প্ররোচিত করে গোনাহ ও নাফরমানীর পথে টেনে আনার চেষ্টা করাই হচ্ছে নির্ভেজাল শয়তানের পথ বিপরীত পক্ষে মানুষের উপযোগী পথটি হচ্ছেঃ প্রথমত শয়তানের প্ররোচান ও অপহরণ প্রচেষ্টার মোকাবিলা করতে হবেতার এ প্রচেষ্টায় বাধা দিতে হবেনিজের শত্রুর চাল ও কৌশল বুঝাতে হবে এবং তার হাতে থেকে বাচার জন্যে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে কিন্তু এরপর যদি কখনো তার পা বন্দেগী ও আনুগত্যের পথ থেকে সরেও যায় তাহলে নিজের ভূল উপলব্ধি করার সাথে সাথেই লজ্জায় অধোবদন হয়ে তাকে নিজের রবের দিকে ফিরে আসতে হবে এবং নিজের অপরাধ ও ভুলের প্রতিকার ও সংশোধন করতে হবেএ কাহিনী থেকে মহান আল্লাহ এ মৌল শিক্ষাটিই দিতে চানএখানে মানুষের মনে তিনি একথাগুলো বদ্ধমূল করে দিতে চান যে, তোমরা যে পথে চলছো সেটি শয়তানের পথএভাবে আল্লাহর হেদায়াতের পরোয়া না করে জিন ও মানুষের মধ্যকার শয়তানদেরকে নিজেদের বন্ধু ও অভিভাবকে পরিণত করা এবং ক্রমাগত সতর্ক বাণী উচ্চারণ করার পরও তোমাদের এভাবে নিজেদের ভুলের ওপর অবিচল থাকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া মূলত নির্ভেজাল শয়তানী কর্মনীতি ছাড়া আর কিছুই নয়তোমরা নিজেদের আদি ও চিরন্তন দুশমনের ফাঁদে আটকা পড়ছোএবং তার কাছে পূর্ণ পরাজয় বরণ করছোশয়তান যে পরিণতির মুখোমুখি হতে চলেছে, তোমাদের এ বিভ্রান্তির পরিণামও তাই হবেযদি তোমরা সত্যিই নিজেরা নিজেদের শত্রু না হয়ে গিয়ে থাকো এবং তোমাদের মধ্যে সামান্যতম চেতনাও থেকে থাকে, তাহলে তোমরা নিজেদের ভুল শুধরিয়ে নাও, সতর্ক হয়ে যাও এবং তোমাদের বাপ আদম ও মা হাওয়া পরিশেষে যে পথ অবলম্বন করেছিলেন তোমরাও সেই একই পথ অবলম্বন করো

০৪. আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
ক. শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু, তার প্রতিশ্রতি মিথ্যা, সে ধোঁকা দিয়ে মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে চায়, তাই তার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে
খ. শয়তানের চক্রান্তে পড়ে অন্যায় করলে সঙ্গে সঙ্গে তাওবাহ করা উচিত, এটাই আদম (আঃ)-এর বৈশিষ্ট্যআর তাওবাহ না করে অপরাধে অটল থাকা শয়তানের কাজ

০৫. উপসংহারঃ
জীবনের সর্বক্ষেত্রে আমাদেরকে নবীদের পথ অনুসরণ করতে হবে। অপরাধ, ভুল ও গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে তাওবাহ করে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে উপরোক্ত বিষয়ের উপর আমল করার তাওফীক দান করুন, আমীন।

Tuesday, 10 December 2019

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রাহিঃ)-এর জীবন ও কর্মঃ


উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ, বাংলা ভাষায় বুখারী’-এর প্রথম অনুবাদক ; 

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রাহিঃ)-এর জীবন ও কর্মঃ




বাংলাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম, উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ, ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিষ্ঠাতা, খেলাফত মজলিসের অভিভাবক পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, ইসলামী চিন্তাবিদ এবং বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব হযরত মাওলানা শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রাহিঃ) সাহেবকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন 'হরকাতুল জিহাদ' এর প্রতিষ্ঠাতা ও জঙ্গিনেতা হিসেবে উল্লেখ করে ভুমি দস্যু বাবুলের যমুনা টিভিতে মিথ্যা, বানোয়াত ও বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ উপস্থাপনের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি
আসুন জেনে নেইঃ কে ছিলেন শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রাহিঃ)?
মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর পরগনার লৌহজং থানার ভিরিচ খাঁ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে ১৩২৬ বাংলা সনের পৌষ মাসে ১৯১৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক
তাঁর বাবার নাম আলহাজ্ এরশাদ আলীতিনি মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তার মাকে হারানফলে নানা বাড়িতে নানি ও খালার কাছে তাঁর শৈশব কাটে
গ্রামের মক্তবে কিছুদিন পড়ার পর সাত বছর বয়সে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জামেয়া ইউনুসিয়া শায়খুল হাদিস মাদ্রাসায় ভর্তি হনসেখানে মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. এর তত্ত্বাবধানে চার বছর লেখাপড়া করেন
শায়খুল হাদিস ছয় দশকেরও বেশি সময় হাদিসের চর্চা ও পাঠদানের সঙ্গে জড়িত ছিলেনতিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব
চারদলীয় জোট প্রতিষ্ঠাকালীন তিনি ছিলেন অন্যতম শীর্ষ নেতা
১৯৯৩ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে যে লংমার্চ হয়েছিল তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শায়খুল হাদিস
মোহাম্মদপুর সাতমসজিদ জামেয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসাসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলেছেন
মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর পরগনার লৌহজং থানার ভিরিচ খাঁ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে ১৩২৬ বাংলা সনের পৌষ মাসে ১৯১৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন শায়খুল হাদিস
তাঁর বাবার নাম আলহাজ্ এরশাদ আলীতিনি মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তার মাকে হারানফলে নানা বাড়িতে নানি ও খালার কাছে তাঁর শৈশব কাটে
গ্রামের মক্তবে কিছুদিন পড়ার পর সাত বছর বয়সে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জামেয়া ইউনুসিয়া শায়খুল হাদিস মাদ্রাসায় ভর্তি হনসেখানে মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. এর তত্ত্বাবধানে চার বছর লেখাপড়া করেন
১৯৩১ সালে ঢাকা বড় কাটারা মাদ্রাসায় ভর্তি হনসেখানে কৃতিত্বের সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ধাপ দাওরায়ে হাদিস পাস করেন
এ সময়ে আল্লামা জফর আহমদ উছমানি, আল্লামা রফিক কাশ্মিরী, মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. প্রমুখ বিজ্ঞ হাদিস বিশারদদের কাছে কুরআন হাদিসের জ্ঞান লাভ করেন
১৯৪৩ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য শায়খুল হাদিস ভারতের বোম্বের সুরত জেলার ডাভেল জামেয়া ইসলামিয়ায় ভর্তি হন
সেখানে মাওলানা শাব্বির আহমাদ উসমানি রহ. ও মাওলানা বদরে আলম মিরাঠী প্রমুখের কাছে শিক্ষা লাভ করেনশাব্বির আহমাদ উসমানি রহ. বুখারি শরিফের যে আলোচনা করেন তা তিনি নোট করে রাখেন
পরবর্তী জীবনে এ ব্যাখ্যাই তার জীবনের বিশেষ সম্বল হয়ে ওঠেসর্বশেষ ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে মাওলানা ইদরিস কান্ধলবি রহ. এর তত্ত্বাবধানে তাফসির বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন
পরে তার ওস্তাদ মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. এর নির্দেশে ঢাকায় চলে আসেন
ভারতের ডাভেলে জামেয়া ইসলামিয়ায় উচ্চ শিক্ষা শেষে সেখানে অধ্যাপনার দায়িত্ব নেয়ার আহবাদ জানানো হলেও তার মুরুব্বিদের নির্দেশে ঢাকার বড় কাটারা মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন
সেখানে দক্ষতার সঙ্গে ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন১৯৫২ সালে লালবাগ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শিক্ষকতা শুরু করেন১৯৫২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বুখারি শরিফসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের পাঠদান করেন
কৃতিত্বের সঙ্গে বুখারি শরিফের অধ্যাপনায় ব্যাপৃত থাকায় তাকে শায়খুল হাদিসখেতাব দেয়া হয়এ সময়েই বুখারি শরিফের বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়লালবাগে অধ্যাপনার ফাঁকে ১৯৭১ সাল থেকে দুই বছর বরিশাল জামিয়া মাহমুদিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন
১৯৭৮ সালের এপ্রিলে কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে বুখারি শরিফের অধ্যাপনা করেন
শায়খুল হাদিস তিন বছর ওই দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৮৬ সালে জামিয়া মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া নামে মোহাম্মাদপুরে মোহাম্মাদী হাউজিং এ একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন
১৯৮৮ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি মোহাম্মাদপুরে সাত মসজিদের পাশে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া নামে স্থানান্তরিত হয়তিনি এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান মুরুব্বি ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন
তিনি মালিবাগ জামিয়া শরইয়্যায়ও প্রিন্সিপাল হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেনজামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার শায়খুল জামিয়াশায়খুল হাদীসহিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ মাদ্রাসায় শায়খুল হাদিসহিসেবে হাদিসের খেদমত করেন
তিনি হাদিসের একজন গবেষক হিসেবে অধ্যাপনার পাশাপাশি সারা দেশেই ইসলামের দাওয়াত নিয়ে হাজির হনতার বয়ান শুনতে হাজার হাজার লোক জমায়েত হতোতিনি লালবাগ কেল্লা জামে মসজিদ, মালিবাগ শাহী মসজিদ ও আজিমপুর স্টেট জামে মসজিদে খতিব হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন
জাতীয় ঈদগাহেও ইমামতি করেছেন বেশ কয়েক বছরতিনি আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দীর্ঘ দিন দায়িত্ব পালন করেনএছাড়াও তিনি বিভিন্ন মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন
ছাত্রজীবনেই ইংরেজ খেদাও আন্দোলনে শায়খুল হাদিস বিশেষ ভূমিকা রাখেনএ সময় ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের কারণে নির্যাতন সহ্য করেনপাকিস্তান আমলে মাওলানা আতহার আলী, মুফতি শফী রহ. প্রমুখের সঙ্গে নেজামে ইসলাম পার্টির কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সে সময় উলামায়ে কেরামের একমাত্র দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন১৯৮১ সালে হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর ডাকে খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন
১৯৮২ সালে হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর সফরসঙ্গী ও মুখপাত্র হিসেবে ইরান, ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্য সফর করেনএ সফরে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধতার ব্যাপারে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলাপ-আলোচনা করেন
ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধের জন্য আয়াতুল্লাহ খোমেনী ও প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন
১৯৮৭ সালে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনএ সময় তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন১৯৮৯ সালে ৮ ডিসেম্বর খেলাফত মজলিস প্রতিষ্ঠা করেন
১৯৯১ সালে সমমনা ইসলামি কয়েকটি দল নিয়ে ইসলামী ঐক্যজোট গঠন করেনতিনি এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেনতার নেতৃত্বে ইসলামী ঐক্যজোট ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১টি আসন (সিলেট-৫) লাভ করে
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদে বাবরী মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে শায়খুল হাদিস মিছিল, মিটিং ও আন্দোলনে সক্রিয় হন১৯৯৩ সালের ২-৪ জানুয়ারি বাবরী মসজিদ পুনঃ নির্মাণের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে যশোর বেনাপোল হয়ে অযোধ্যা অভিমুখে লংমার্চের নেতৃত্ব দেনএ লংমার্চে পাঁচ লক্ষাধিক লোক স্বত:স্ফূর্তভাবে অংশ নেয়
শায়খুল হাদিস বাবরী মসজিদ ভাঙার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসীমরাওকে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষনা করেন এবং বিমান বন্দর ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দেনফলে তৎকালীন সরকার ৯ এপ্রিল ১৯৯৩ সালে তাকে গ্রেফতার করে৮ মে ১৯৯৩ সালে সরকার শায়খুল হাদিসকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়
শায়খুল হাদিসের অনন্য অবদান হলো, বুখারি শরিফের বঙ্গানুবাদপ্রথমে সাত খণ্ডে ও বর্তমানে ১০ খণ্ডে সমাপ্ত বুখারি শরীফের এ বিশদ ব্যাখ্যাগ্রন্থটি আলেম ও সাধারণ শিক্ষিত সবার কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছেবুখারি শরিফ অনুবাদ ১৯৫২ সালে হজের সফরে শুরু করেন১৬ বছরের কঠোর সাধনায় তা সমাপ্ত করেনএর অনেক অংশই তিনি রওজা শরিফের পাশে বসে অনুবাদ করেন
ছাত্রজীবনে বুখারি শরিফের উর্দু ব্যাখ্যা (শরাহ) লিখেন১৮০০ পৃষ্ঠার এ বৃহৎ গ্রন্থটি ফজলুল বারি শরহে বুখারিনামে পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত হয়েছেমুসলিম শরিফ ও অন্যান্য হাদীসের ছয় কিতাবনামে অনবদ্য এক হাদিসগ্রন্থ সংকলন করেন
এতে বিষয়ভিত্তিক হাদিসসমূহ অনুবাদসহ উপস্থাপন করা হয়েছেএর দুই খণ্ড প্রকাশিত হয়েছেএছাড়া মছনবীয়ে রূমীর বঙ্গানুবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ ও ইসলাম, কাদিয়ানি মতবাদের খণ্ডন, মাসনূন দোয়া সম্বলিত মুনাজাতে মাকবূল, সত্যের পথে সংগ্রাম এসব বইয়ের রচয়িতাও তিনি
তিনি দীর্ঘ দিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন২০১২ সালের ৮ আগস্ট, বুধবার দুপুর সাড়ে বারোটায় আজিমপুরে নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছরতিনি পাঁচ ছেলে, আট মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ আত্মীয়-স্বজন, অসংখ্য রাজনৈতিক সহকর্মী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন
দেশে ও দেশের বাইরে তাঁর অসংখ্য ছাত্র রয়েছেতার পরিবারের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ প্রায় ৭০ জন সদস্য কোরআনে হাফেজ
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যেন, এদেশের ইসলামের এই প্রচারক, হাদীস বিশারদ ও শিক্ষককে জান্নাতে সর্বোচ্চ মাকাম দান করেনআমীন

জেনে নিন ; কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত কিছু নিষিদ্ধ কর্মসমূহঃ

জেনে নিন ; কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত কিছু নিষিদ্ধ কর্মসমূহঃ
সংগ্রহ, তাখরীজ ও তাহক্বীক্ব : আব্দুস সালাম হুসাইন আলী


কুরআন ও হাদীস নামক সাগর-মহাসাগরের অুনেক রত্ন, হিরা, মনি-মুক্তাতূল্য বাণী-মহাবাণীই তো আমাদের অজানা, অচেনা। আমরা ছোট্ট ভাষা ব্যবহারকারী প্রাণী হিসেবে পৃথিবী নামক গ্রহেরই তো বহু কিছু জানিনা। সেই অজানা, জানতে ও অচেনাকে চিনতে হলে আমাদের পাঠ করতে হবে আল-কুরআন ও হাদীস। আর বাস্তব অনুশীলনের জন্য আমল করতে হবে। তাহলে আমাদের ভিতর থেকে মূর্খতা নাম্নীয় (জাহালত) অন্ধকারাচ্ছন্নতা দূরীভূত হয়ে বিদ্যা নাম্নীয় (নূর) জ্যোতির আগমন ঘটবে। যেই (নূর) জ্যোতির মাধ্যমে মানব জাতির ইহ-লৌকিক ও পর-লৌকের সকল কল্যাণ, মঙ্গল ও সফলতার সুবাতাস প্রবাহ হবে। তাই চলুন জেনে নিই কু্রআন ও হাদিসে বর্ণিত কিছু নিষিদ্ধ কর্ম ; যা আমরা না জেনে প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছিঃ

০১. ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুশরিক কাউকে বিয়ে করা যাবে না[সূরা বাক্বারা : ২২১]।

০২. মুর্তি কেনা-বেঁচা, পাহারা দেওয়া হারাম[সূরা মাইদাহ : ৯০, সূরা ইবরাহীম : ৩৫)]।

০৩. স্বামী ব্যাতিত অন্য কারোর জন্য সাজা (রূপ-সজ্জা করা) হারাম[সূরা আহজাব : ৩৩)]

০৪. উপুর হয়ে বুকের উপরে ভর দিয়ে শোয়া নিষিদ্ধ, কারণ এইভাবে শয়তান শয়ন করে। [সহীহ বুখারী ৭৬৯ (ই. ফা), আবু দাউদ ৫০৪০, তিরমিযী ২৭৬৮, ইবনু মাযাহ ৩৭২৪]।

০৫. দাঁড়িয়ে এবং বাম হাতে খাওয়া বা পান করা নিষিদ্ধ, কারণ দাঁড়িয়ে এবং বাঁ হাতে শয়তান খায় ও পান করে[সহিহ মুসলিম ২০২০, তিরমিযী ১৭৯৯, রিয়াদুস সালেহীন]

০৬. গোসলখানায় প্রসাব করা যাবে না[ইবনে মাযাহ ৩০৪]

০৭. কেবলামুখী বা তার উল্টো হয়ে প্রসাব, পায়খানা করা যাবে না[সহিহ বুখারি ৩৯৫]

০৮. গুলি বা তীরের নিশানা প্রশিক্ষণের জন্য প্রাণী ব্যবহার করা যাবে না[মুসলিম ৫১৬৭]

০৯. কারো মুখমণ্ডলে আঘাত করা যাবে না[মুসলিম ৬৮২১]

১০. কাপড় পরিধাণ থাকা সত্তেও কারো গোপন অঙ্গের জায়গার দিকে দৃষ্টিপাত করা যাবে না[মুসলিম ৭৯৪]

১১. আল্লাহ ব্যাতিত কারো নামে কসম করা যাবে নাবাপ দাদার নাম, কারো হায়াত, মসজিদ বা কুরআন এর নামে কসম করা, মাথায় নিয়ে সত্যতা প্রকাশ করা যাবে না[আবু দাউদ৩ ২৫০, নাসায়ী ৩৭৭৮]।

১২. কোন প্রাণীকে আগুনে পুড়িয়ে মারা যাবে না[আবু দাউদ ২৬৭৭]

১৩. পশুর হাড় দিয়ে ইস্তিঞ্জা করা নিষিদ্ধ, কারণ আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করা প্রাণীর হাড়গুলো যা মানুষেরা ফেলে দেয়, তা মুসলিম জিনদের খাবার[সহীহ বুখারী ৩৮৫৯, সহিহ মুসলিম ৪৫০ (শামিলা) ৮৯১ (ই. ফা)।]

১৪. রাসুল (সাঃ) সূর্যাস্তের পর বাচ্চাদের বাড়ির বাইরে বের করতে নিষেধ করেছেন এবং ঘরের দরজা জানালা বন্ধ রাখতে বলেছেন, কারণ তখন জিনেরা বাইরে বের হয় [সহিহ মুসলিম ২০১৩]।

১৫. আযান দিলে শয়তান ও জিনেরা বায়ু ছাড়তে ছাড়তে লোকালয় থেকে পলায়ন করেআর কুকুর ও গাধা শয়তান জিনদেরকে দেখতে পেলে চিৎকার করেএকারণে, অনেক সময় ইশা বা ফযরের আযান দিলে কুকুরেরা চিৎকার চেচামেচি শুরু করেকারণ তখন কুকুরেরা আযান শুনে পলায়নরত শয়তান জিনদের দেখতে পায়উল্লেখ্য, রাতের বেলা কুকুর ও গাধার ডাক শুনলে ‘‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনীর রজীম" এই দুয়া পড়ে শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ কাছে আশ্রয় চাইতে হয়[সহিহ বুখারী ৩৩০৩, সহিহ মুসলিম ২৭২৯, তিরমিযী ৩৪৫৯, আদাবুল মুফরাদ ১২৩৪, আবু দাউদ ৫১০৩, ইবনু খুযাইমা ২৫৫৯, ইবনু হিব্বান ৫৫১৭-১৮, ত্ববারানী ২০০৮, শারহুস সুন্নাহ ৩০৬০, ইবনুস সুন্নী ৩০৩]।

১৬. মোরগ আল্লাহর রহমতের ফেরেশতাদেরকে দেখতে পায়, একারণে মোরগের ডাক শুনে "আল্লাহুম্মা ইন্নিআস-আসুকা মিং ফাযলিকা" এই দুয়া পড়ে আল্লাহর অনুগ্রহ চাইতে হয়[সহিহ বুখারী ৩৩০৩, সহিহ মুসলিম, ২৭২৯]

সুতরাং আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে উপরোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলার এবং আমল করার তাওফীক দান করুন, আমীন