Thursday, 25 April 2019

লক্ষ্য করুন! দেখুন, শুনুন, ভাবুন, চিন্তা করুন ; অতঃপর সঠিক স্বিদ্ধান্ত গ্রহণ করুনঃ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
লক্ষ্য করুন! দেখুন, শুনুন, ভাবুন, চিন্তা করুন 
অতঃপর সঠিক স্বিদ্ধান্ত গ্রহণ করুনঃ
মুফতি আব্দুস সালাম হুসাইন আলী
 

১০০ টাকা মসজিদে দান করা বড় দেখায়, অথচ মশপিং মলে কেনাকাটার জন্য তা কতইনা ছোট

মসজিদে দুই ঘন্টা ঈবাদাত! কত দীর্ঘ সময়, কিন্তু সিনেমা হলে তা খুবই সামান্য
তারাবী (ক্বিমাইল-লাইল)-এর সালাতে/নামাযে দীর্ঘ ৬০ মিনিট (১ঘন্টা) সময়, অথচ একটা ফুটবল ম্যাচ মাত্র ৯০ মিনিট

একটা ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে মাত্র ৬ ঘন্টা সময় লাগে, তাতে কোন কষ্ট নেই, বরং উত্তেজনামূলক ও আনন্দদায়ককিন্তু জুমআর খুতবাহ্ একটু দীর্ঘায়িত হলে তা বিরক্তিকর

কুরআনের একটি আয়াত পড়া খুবই কষ্টকর, অথচ ২০০ পৃষ্ঠার উপন্যাস পড়া কতইনা সহজ

কনসার্ট বা খেলার মাঠে সামনের সারিতে কত প্রতিযোগিতা, অথচ মসজিদে যত পিছনে বসা যায় ততই ভাল

রেডিও, টি.ভি ও সংবাদ পত্রের খবর আমরা কত সহজে বিশ্বাস করি, কিন্তু আল্লাহর কুরআনের একটি আয়াত ও নবী (সা) এর হাদীস বিশ্বাস করা ও মানা অনেক কষ্টকর

বিজ্ঞাপন বা লিফলেট কত সহজে প্রচার করি, কিন্তু আল্লাহ, নবী ও ইসলামের বাণী প্রচারে আমরা হাজার বার চিন্তা করি

মন্তব্য : এ আক্বীদা বা বিশ্বাসই কি একজন সত্যিকার মুসলিমের পরিচয়? একজন মুমিন ও মুসলিম ব্যক্তির এমন হওয়াটা কি যুক্তিসঙ্গত?

সমাধান : না, কখনই না, অবশ্যই নাবরঞ্চ সর্বদা এর বিপরীতে নিজেকে ইসলামের জন্য চরম আত্মসমর্পনকারী ও একজন নিবেদিত প্রান মনে করে জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে ইসলামী অনুশাসনের যথাযথ বাস্তবায়নে প্রস্তুত থাকতে হবেএমনটাই হলো একজন সত্যিকার মুমিন ও মুসলিম ব্যক্তির ধারণা ও মানসিক পরিচয়

মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে আলোচিত সমাধানের উপর আমল করার তাওফীক দিন, আমীনধন্যবাদ সকলকে

ভাল লাগলে লাইক করে শেয়ার করুন

আদর্শ সমাজ বিনির্মানে ইসলামী, নৈতিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকল্প নেইঃ


মানব চেতনা শক্তিকে শাণিত করার জন্য বিবেকসহ আবেগের সুব্যবহারঃ

আদর্শ সমাজ বিনির্মানে ইসলামী
নৈতিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকল্প নেইঃ
মুফতি আব্দুস সালাম হুসােইন আলী

♦ ২য় সংস্করণ (২৫ এপ্রিল ২০১৯)
♦ সমগ্র বিশ্বের মানবজাতি আজ একহাক্রান্তিলগ্ন অতিক্রম করছে এবং গোটা পৃথিবী অাজ অস্থিরতায় ভুগছেইসলামের ইলমে নাবাবি, নৈতিকতা, মূল্যবোধের অভাব ও অবক্ষয়ের কারণে মানবতা মুক্তি ও কল্যাণের সন্ধানে হন্যে হয়ে ফিরছেমানবরচিত মতবাদ ও বস্তুবাদি শিক্ষাব্যবস্থা তাকে যতটা জাগতিক উন্নতি এনে দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে

♦ অথচ প্রমাণিত সত্য হচ্ছে, বিশ্বমানবতাকে ধ্বংস, অবক্ষয়, অকল্যাণ ও অমঙ্গল থেকে বাঁচিয়ে ইহ-লৌকিক ও পার-লৌকিকের সফলতার সন্ধান পেতে হলে ধর্মিয় তথা ইসলামি নৈতিক শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং তাহযিব-তামাদ্দুনের প্রচার-প্রসার ঘটাতে হবেআর এ জন্য কুরআন ও সহিহ আক্বিদা বনাম সহিহ সুন্নার জ্ঞানের কোন বিকল্প নেই

♦ সেই সাথে মুক্তমন, উদার হৃদয়, আল্লাহর সন্তুষ্ঠি ও রাসূল (সা)-এর অনুসরণই একমাত্র দিশা দিতে পারে

♦ ধন্যবাদ সকলকে২৫ এপ্রিল ২০১৯

Wednesday, 10 April 2019

বিবাহ ও বিবাহের জন্য পাত্র-পাত্রী (বর-কনে) নির্বাচনে লক্ষ্যনীয় গুণাবলীঃ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
বিবাহ ও বিবাহের জন্য 
পাত্র-পাত্রী (বর-কনে) নির্বাচনে লক্ষ্যনীয় গুণাবলীঃ
আব্দুস সালাম হুসাইন আলী

০১. বিয়ের আসল উদ্দেশ্য হলো মানব অস্তিত্বের ধারা অব্যাহত রাখাবৈধভাবে যৌন তৃপ্তি অর্জন এবং স্নেহ ভালোবাসা, সহানুভূতি, নি:স্বার্থ সেবাভিত্তিক সুস্থ সমাজ জীবন গড়ে তোলা

০২. এজন্য একজন উত্তম স্ত্রী কেবল সেই হতে পারে যে নারী তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন ও সজাগ এবং উত্তম পন্থায় তাঁহার স্ত্রী সুলভ দায়িত্ব পালোনে হবে সক্ষম, নীতি, চরিত্র ও জ্ঞান বুদ্ধিতে হবে সে নারী আদর্শস্থানীয়াআর এজন্যই এমন স্ত্রী নির্বাচন করা উচিত যার অন্তর হবে ঈমানের আলোয় উদ্ভাসিতযার কথা ও কাজ হবে যথার্থ মুসলিম, চরিত্র হবে সুন্দর, শ্লীলতা-শালীনতা, পবিত্রতার ব্যাপারে হবে সচেতন 

০৩. মহান আল্লাহ্ তাআলার ঐশীগ্রন্থ আল-কুরআন ও রাসূল (সা.)-এর মুখনিসৃত হাদীসে বর্ণিত একজন সতী-সাধবী, পূণ্যবতী স্ত্রী, আদর্শ নারী / রমণী, নর্ম-ভদ্র, কোমল-বিনয়ী, সচ্চরিত্রা স্ত্রী বা তরুণী বা কন্যা বা মহিলাই হলো আদর্শ নারী আর একজন আদর্শ নারী হলেন সুখময় দাম্পত্য জীবন, সুখী পরিবার গঠন ও সৌভাগ্যের চাবি স্বরূপ।

০৪. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিতনাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
 تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَاوَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ
‘চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারীসুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে [সহীহ বখারী হা/নং ৫০৯০, সহীহ মুসলিম হা/নং১৪৬৬, সুনান নাসাঈ হা/নং ৩২৩০, সুনান আবু দাউদ হা/নং ২০৪৭, সুনান ইবনু মাজাহ হা/নং ১৮৫৮, সুনান আহমাদ হা/নং ৯৫২৬]

০৫. ব্যবখ্যাঃ যে সব কারণে একজন পুরুষ বিশেষ একটি মেয়েকে স্ত্রীরূপে বরণ করার জন্য উৎসাহিত ও আগ্রহান্বিত হতে পারে তা হচ্ছে চারটি। (১) সৌন্দর্য (২) সম্পদ (৩) বংশ (৪) দীনদারী এ গুণ চতুষ্টয়ের মধ্যে সর্বশেষে উল্লেখ করা হয়েছে দীনদারী ও আদর্শবাদিতার গুণ আর এ গুণটিই ইসলামের দৃষ্টিতে সর্বাগ্রগণ্য ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আলোচ্য নির্দেশের সার কথা হল- দীনদারীর গুণসম্পন্না কনে পাওয়া গেলে তাকেই যেন স্ত্রীরূপে বরণ করা হয়, তাকে বাদ দিয়ে অপর কোন গুণসম্পন্না মহিলাকে বিয়ে করতে আগ্রহী হওয়া উচিত নয়- (সুবুলুস সালাম) চারটি গুণের মধ্যে দ্বীনদার হওয়ার গুণটি কেবল যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা-ই নয়, এ গুণ যার নেই তার মধ্যে অন্যান্য গুণ যতই থাক না কেন, ইসলামের দৃষ্টিতে সে অগ্রাধিকার যোগ্য কনে নয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস অনুযায়ী তো দ্বীনদারীর গুণ বঞ্চিতা নারী বিয়ে করাই উচিত নয় তিনি স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন- তোমরা স্ত্রীদের কেবল তাদের রূপ-সৌন্দর্য দেখেই বিয়ে করো না- কেননা এরূপ সৌন্দর্যই অনেক সময় তাদের ধ্বংসের কারণ হতে পারে তাদের ধন-মালের লোভে পড়েও বিয়ে করবে না, কেননা এ ধনমাল তাদের বিদ্রোহী ও অনমনীয় বানাতে পারে বরং তাদের দ্বীনদারীর গুণ দেখেই তবে বিয়ে করবেবস্ত্তত একজন দীনদার কৃষ্ণাঙ্গ দাসীও কিন্তু অনেক ভাল- (ইবনে মাজাহ, বাযযার, বাইহাকী) 

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- বিয়ের জন্য কোন্ ধরনের মেয়ে উত্তম? জবাবে তিনি বলেছিলেন- যে স্ত্রীকে দেখলে সে তার স্বামীকে আনন্দ দেয়, তাকে যে কাজের আদেশ করা হয় তা সে যথাযথ পালন করে এবং তার নিজের স্বামীর ধন মালের ব্যাপারে স্বামীর পছন্দের বিপরীত কোন কাজই করে না- (মুসনাদে আহমাদ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন- দুনিয়ার সব জিনিসই ভোগ সামগ্রী আর সবচেয়ে উত্তম সামগ্রী হচ্ছে নেক চরিত্রের স্ত্রী- (মুসনাদে আহমাদ)

০৬. উপরে উদ্ধৃত হাদীসগুলো থেকে সে কথাটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা এই যে, ইসলামের দৃষ্টিতে তাকওয়া, পরহেযগারী, দীনদারী ও উন্নত চরিত্রই হচ্ছে জীবন সঙ্গিনী পছন্দ করার ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় 

০৭. সারাংশঃ বিবাহের জন্য পাত্র-পাত্রী (বর-কনে) নির্বাচনে লক্ষ্যনীয় গুণাবলীঃ
. বর-কনের অন্যতম প্রধান গুণ হচ্ছে দ্বীনদার ও ধার্মিক হওয়া
২. বর-কনেকে তাক্বওয়াবান তথা মুত্তাক্বী (আল্লাহভীরু ও সাবধানতা অবলম্বনকারী) হওয়া।
৩. বর-কনের সৌন্দর্যতা, রূপ-লাবন্যতার প্রতি স্বাভাবিকভাবে লক্ষ্য রাখা।
৪. বর-কনের ধন-সম্পদ, অর্থ-প্রাচুর্যতা, সহায়-সম্পত্তির প্রতি স্বাভাবিকভাবে লক্ষ্য রাখা।
৫. বর-কনের বংশ গৌরব, বংশীয় ঐতিহ্যের প্রতি স্বাভাবিকভাবে লক্ষ্য রাখা।
৬. বর-কনের কুফু উভয়ের অর্থনৈতিক ও পারিবারিক সমতার প্রতি স্বাভাবিকভাবে লক্ষ্য রাখা।

৭. বর-কনের সামাজিক মান-মর্যাদার প্রতি স্বাভাবিকভাবে লক্ষ্য রাখা।

Tuesday, 9 April 2019

মাযহাব মানা ও অনুসরণ করার মানদন্ড


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
মাযহাব মানা ও অনুসরণ করার মানদন্ড
আব্দুস সালাম হুসাইন আলী

ইমাম ‘আজম আবূ হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ) তার মাযহাব অনুসরণে চারটি মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। যথা :
১. ইমাম ‘আজম আবূ হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন :
إِذَا صَحَّ الْحَدِيْثُ فَهُوَ مَذْهَبِيْ হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব[রাসমুল মুফতী ১/৪, হাশিয়া ইবনু আবিদীন ১/৬২ ও ৬৩]

২. ইমাম ‘আজম আবূ হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন :
لاَ يَحِلُّ لِأَحَدٍ أَنْ يَأْخُذَ بِقَوْلِنَا مَالَمْ يَعْلَمْ مِنْ أَيْنَ أَخَذْنَاهُ আমরা কোথা থেকে মাসআলা গ্রহণ করেছি, তা জানার আগ পর্যন্ত আমাদের বক্তব্য গ্রহণ রা কারোর জন্যে জায়েজ নেই [গ নং-এ দেখুন]

. অন্য এক বর্ণনায়  ইমাম ‘আজম আবূ হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন :
حَرَامٌ عَلَى مَنْ لَمْ يَعْرِفَ دَلِيْلِيْ أَنْ يُفْتىٰ بِكَلَامِيْ যে ব্যক্তি আমার দলীল-প্রমাণ জানে না, তার জন্য আমার বক্তব্য দিয়ে ফাতুওয়া দেওয়া হারাম অন্য এক বর্ণনায় তাঁর আরো একটি কথা যোগ করে বলা হয়েছে, আমরা মানুষ আজ যে কথা বলি কাল সে কথা প্রত্যাহার করি 
 [ইবনে আব্দিল বার, ‘আল-ইনতেক্বাউ ফি ফাযায়িলিছ ছালাছাতুল আইম্মাতুল ফুক্বাহাউপৃঃ ১৪৫, ইবনিল কাইয়্যিম, লামুল মুওয়াক্বিঈন ২/৩০৯, ইবনে আবিদীন, বাহরুর রায়িক্ব-এর (হাশিয়া) টীকা ৬/২৯৩, রাসমুল মুফতী পৃঃ ২৯ ও ৩২, আশ-শারানী, আল-মীযান ১/৫৫]

৪. অন্য এক বর্ণনায়  ইমাম ‘আজম আবূ হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন :
إِذَا كَانَ خِلَافَ الُقْرآَنَ وَالسُّنَّةَ أَتْرُكُوْا قَوْلِيْ بِخَبَرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ আমার কোনো কথা যদি কুরআন  হাদীসের বিপরীত হয়, তাহলে আমার বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান কর [আল-ফালানী, আল-ইক্বায পৃঃ ৫০, আশ-শারানী, আল-মীযান ১/২৬]

৫. উপসংহারঃ
সুতরাং মিথ্যা, জাল, বানোয়াট  দুর্বল হাদিসের উপর আমল করা ইমাম আবু হানিফা (রঃ)-এর মাযহাবের অনুসরণ হতে পারে না। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা আমাদেরকে প্রকৃত মুসলিম হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন, আমীন।

Monday, 8 April 2019

শবে বরাত ; একটি পর্যালোচনা (পাঠ ০২)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
শবে বরাত ; একটি পর্যালোচনা (পাঠ ০২)
প্রচলিত শবে বরাত কেন্দ্রিক ইবাদত; ইসলাম অনুমোদিত না উপেক্ষিত?
মুফতি আব্দুস সালাম হুসাইন আলী


. বরাত প্রমাণের মূল ভিত্তি হলো; মিথ্যা, জাল, বানোয়াট, দুর্বল হাদিস কুরআনের অপব্যাখ্যাঃ
সম্মানিত বিজ্ঞ মহল, সুস্থ্য সচেতন সূধী! আল-কুরআনের সূরা দুখানের - নং আয়াতের অসমর্থিত, অপব্যাখা শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কিত কয়েকটি মিথ্যা, জাল, বানোয়াট দুর্বল হাদিসই হচ্ছে শবে বরাত পালন বা উদযাপনের মূল ভিত্তি এরই ভিত্তিতে আলেম-উলামাগণ এবং মসজিদের সম্মানিত ইমাম খতীবগণ আমাদেরকে শবে বরাতের ফজিলত, তাৎপর্য মাহাত্ব বর্ণনা দিয়ে ওয়াজ নসীহত করেন এবং সু-মিষ্ট বয়ান শুনিয়ে থাকেন অথচ মিথ্যা, জাল, বানোয়াট দুর্বল হাদিসের উপর ভিত্তি করে শরীয়তের মধ্যে কোন নতুন বিষয় প্রবর্তন করা যায় না কেননা মিথ্যা, জাল বানোয়াট হাদিস যা রাসূল (সাঃ)-এর হাদিস নয় বলে প্রতিয়মান হয় তার উপর নির্ভর করে কোন কাজ প্রচলন করা যায় না  তবে হ্যাঁ, কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত বা প্রতিষ্ঠি আমলের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদিস গ্রহন করা যেতে পারে মর্মে কথিত রয়েছে যেহেতু সাধারণ মুসলিম সমাজের মাঝে আলেমদের মুখনিসৃত হাদিসের কথা শোনে তদানুযায়ি আমল করার আগ্রহ দেখা যায়, সেহেতু কুরআন সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ি বিজ্ঞ আলেমদের কাছ থেকে ভালভাবে জেনে-শোনে আমল করা উচিত কেননা অনেক ক্ষেত্রে মুক্ষ্য হাদিসটি মিথ্যা, জাল, বানোয়াট দুর্বলও হতে পারে তাই এখানে শবে বরাত সম্পর্কিত আয়াত হাদিসগুলির তুলনামূলক বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করা করা জরুরি যাতে সঠিক বিষয় জানা-মানা উপলব্ধি করে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যে আমল করা যায়

. মিথ্যা, জাল, বানোয়াট দুর্বল হাদিসের উপর আমল না করার জন্য ইমাম আবু হানিফা (রঃ)-এর নির্দেশঃ
মিথ্যা, জাল, বানোয়াট দুর্বল হাদিসের উপর আমল করতে ইমাম আবু হানিফা (রঃ) নিষেধ করেছেন  ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা (রঃ) বলেছেন :
. إِذَا صَحَّ الْحَدِيْثُ فَهُوَ مَذْهَبِيْ হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব [রাসমুল মুফতী ১/৪, হাশিয়া ইবনু আবিদীন ১/৬২ ও ৬৩]
. لاَ يَحِلُّ لِأَحَدٍ أَنْ يَأْخُذَ بِقَوْلِنَا مَالَمْ يَعْلَمْ مِنْ أَيْنَ أَخَذْنَاهُ আমরা কোথা থেকে মাসআলা গ্রহণ করেছি, তা জানার আগ পর্যন্ত আমাদের বক্তব্য গ্রহণ করা কারোর জন্যে জায়েজ নেই [গ নং-এ দেখুন]।
. অন্য এক বর্ণনায় ইমাম আবু হানিফার এই বক্তব্য এসেছে যে, حَرَامٌ عَلَى مَنْ لَمْ يَعْرِفَ دَلِيْلِيْ أَنْ يُفْتىٰ بِكَلَامِيْ যে ব্যক্তি আমার দলীল-প্রমাণ জানে না, তার জন্য আমার বক্তব্য দিয়ে ফাতুওয়া দেওয়া হারাম অন্য এক বর্ণনায় তাঁর আরো একটি কথা যোগ করে বলা হয়েছে, ‘আমরা মানুষ আজ যে কথা বলি কাল সে কথা প্রত্যাহার করি [ইবনে আব্দিল বার, ‘আল-ইনতেক্বাউ ফি ফাযায়িলিছ ছালাছাতুল আইম্মাতুল ফুক্বাহাউ’ পৃঃ ১৪৫, ইবনিল কাইয়্যিম, ই‘লামুল মুওয়াক্বিঈন ২/৩০৯, ইবনে ‘আবিদীন, বাহরুর রায়িক্ব-এর (হাশিয়া) টীকা ৬/২৯৩, রাসমুল মুফতী পৃঃ ২৯ ও ৩২, আশ-শা‘রানী, আল-মীযান ১/৫৫]।
. إِذَا كَانَ خِلَافَ الُقْرآَنَ وَالسُّنَّةَ أَتْرُكُوْا قَوْلِيْ بِخَبَرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ আমার কোনো কথা যদি কুরআন হাদীসের বিপরীত হয়, তাহলে আমার বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করো [আল-ফালানী, আল-ইক্বায পৃঃ ৫০, আশ-শা‘রানী, আল-মীযান ১/২৬]।

. বরাত প্রমাণে সূরা দুখানের অসমর্থিত অপব্যাখার বিবরণঃ
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা এরশাদ করেন :
حمٓ (1) وَالْكِتٰبِ الْمُبِينِ (2) إِنَّآ أَنزَلْنٰهُ فِى لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ (3) فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍحَكِيمٍ (4)
হা-মীম () শপথ সুষ্পষ্ঠ কিতাবের () আমি একে নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী () রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয় [সূরা দুখান : ০১-০৪]।

আনুসাঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয়ঃ যারা শবে বরাতের সমর্থনে আয়াতগুলি উপস্থাপন করেন তারা, لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ বা বরকতময় রজনীর ব্যাখ্যায় শবে বরাতকে উল্লেখ করে থাকেন কিন্তু কুরআনের অন্য স্থানে لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ বা বরকতময় রজনী দ্বারা সুস্পষ্ঠভাবে শবে ক্বদরকে বুঝানো হয়েছে কেননা কুরআনের মূল উৎস হলো : إنَّ الْقُرْآَنَ يُفَسِّرُ بَعْضَهُ بَعْضًا তথা কুরআনের এক অংশ দিয়ে অন্য অংশের ব্যাখ্যা করা হয় উদাহরণসরূপ : اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ ۞ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ হে আল্লাহ আপনি আমাদেরকে সহজ, সরল সঠিক পথে পরিচালিত করুন তাদের পথ যাদেরকে আপনি নিয়ামতের মাধ্যমে অনুগ্রহ করেছেন  [সূরা ফাতিহা : ৫-৬]। এখানে নিয়ামত প্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ স্পষ্ঠ নয়, তাই আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের ব্যাখ্যা অন্য আয়াতে এভাবে করেছেন  মহান আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন :وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর রসূল (সা)-এর হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাঁদের প্রতি আল্লাহ্ নেয়ামত দান করেছেন, সে তাঁদের সঙ্গী হবে তাঁরা হলেন নবী, ছিদ্দীক, শহীদ সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ আর তাদের সান্নিধ্যই হল উত্তম [সূরা নিসা : ৬৯]।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা কথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ঠ হয়েগেছে যে, যেই রাত্রে মহান আল্লাহ কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, সে রাত্রই মহিমান্বিত, গৌরবান্বিত বরকতময় সকল তাফসীরবীদদের অভিমতে সে রাত ছিল লাইলাতুল ক্বদর’ বরাতের রজনী নয় এছাড়াও আল্লাহ তাআলা কুরআনকে রামাদান মাসে অবতীর্ণ করেছেন মর্মে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন : ﴿شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِىٓ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْءَانُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰى وَالْفُرْقَانِ রামাদান মাস যার মধ্যে বিশ্ব মানবের জন্য পথপ্রদর্শক এবং সু-পথের উজ্জল নিদর্শন প্রভেদকারী কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছ ‘। [সূরা বাক্বারা : ১৮৫]। আর উল্লেখ্য যে, ‘লাইলাতুল ক্বদর’ শাবান মাসে হয়না বরং রামাদন মাসে হয় সুতরাং উক্ত ব্যাখ্যা অগ্রহনযোগ্য

১০. মহিমান্বিত, গৌরবান্বিত, বরকত-পূণ্যময় ভাগ্যরজনী কোনটি?
لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ -এর ব্যাখ্যাঃ ইবনে আব্বাস, ইবনে কাসীর, ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম), মুজাহিদ, কাতাদা হাসান বসরী (রাহিমাহুমুল্লাহ) গণসহ তাফসীর শাস্ত্রের দিকপালগণ لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ -এর ব্যাখ্যায় লাইলাতুল ক্বদর’ কেই উল্লেখ করেছেন বিশ্ববিখ্যাত কালোজয়ী প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ) তার تفسير القرآن العظيم (তাফসীরুল কুরআনুল ‘আজীম) এর ধারাভাষ্যমতে : إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ أَيْ هِيَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ  ‘নিশ্চয়ই তিনি কুরআনকে মহিমান্বিত, বরকত-পূণ্যময় ভাগ্যরজনীতে অবতীর্ণ করেছেন’। [সূরা দুখান : ০৩]। আর সেই মহিমান্বিত, গৌরবান্বিত, বরকত-পূণ্যময় ভাগ্যরজনীটি হল ক্বদরের’ রাত

ইমাম শাওক্বানী (রা.) বলেন :
 المراد بليلة المباركة هي الليلة القدر – كما فى قوله تعالي ﴿إنَّآ أنْزَلْنَاهُ فِيْ لَيْلَةِ الْقَدْر 
মহিমান্বিত, গৌরবান্বিত, বরকত-পূণ্যময় ভাগ্যরজনী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো : ‘ক্বদর রজনী’ যেমন আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন : ‘নিশ্চয়ই আমি কুরআনকে ক্বদরের রজনীতে অবতীর্ণ করেছি’। [সূরা ক্বদর : ০১]।

মহান আল্লাহ তাআলঅ এরশাদ করেন : ﴿إنَّآ أنْزَلْنَاهُ فِيْ لَيْلَةِ الْقَدْر নিশ্চয়ই আমি কুরআনকে ক্বদরের রজনীতে অবতীর্ণ করেছি[সূরা ক্বদর : ০১]। ইমাম কুরতুবী (রা.) বলেন শবে বরাতের মর্যাদা এবং এতে মানব জাতির জন্ম-মৃত্যু ভাগ্য লিপিবদ্ধ করার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো হাদীস নেই অত্রঃএব তোমরা রাতের প্রতি কোন গুরুত্ব দিবেনা[তাফসীর কুরতুবী, সূরা ক্বদরের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য]।

১১. শবে বরাতের ফজিলত প্রমাণে দুর্বল হাদীস তার পর্যালোচনাঃ
১নং হাদীসঃ

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ،  رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا يَوْمَهَا، فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُولُ أَلاَ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأَغْفِرَ لَهُ أَلاَ مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلاَ مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ أَلاَ كَذَا أَلاَ كَذَا حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ

আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) থেকে বর্ণিততিনি বলেন, রাসূল (সা) বলেছেনঃ যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা এ রাতে দাঁড়িয়ে সালাত (নামায/নামাজ) পড়ো এবং এর দিনে সওম রাখোকেননা এ দিন সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেনঃ কে আছো আমার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করবোকে আছো রিযিকপ্রার্থী, আমি তাকে রিযিক দান করবোকে আছো রোগমুক্তি প্রার্থনাকারী, আমি তাকে নিরাময় দান করবোকে আছো এই প্রার্থনাকারীফজরের সময় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত (তিনি এভাবে আহবান করেন) তাখরীজ আলবানী: সুনান ইবনু মাজাহ হা/নং ১৩৮৮, মিশকাত ১৩০৮ মাওযূ, যঈফ তারগীব ৬৩২ মাওযূ, যাঈফা ২১৩২ মাওযূ, মিশকাত ১৩০৮, যঈফাহ ২১৩২তাহক্বীক্ব আলবানী: যঈফ জিদ্দান অথবা মাওযু]।


পর্যালোচনা : ইবনে মাযার এই হাদীসের সনদে আবু সাবরা’ নামক একজন বর্ণনাকারী আছেন যিনি, মুহাদ্দীসগণের নিকট অতি দুর্বল ও ভুল হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে আখ্যায়িত পরিচিত।

২নং হাদীসঃ

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ فَقَدْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لَيْلَةً فَخَرَجْتُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ فَقَالَ ‏:‏ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ،‏ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ، فَقَالَ : إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ

আইশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, এক রাতে আমি রাসূল (সা)-কে হারিয়ে ফেললাম (বিছানায় পেলাম না)আমি (তার সন্ধানে) বের হলামএসে দেখলাম তিনি বাকী কবরস্তানে আছেনতিনি বলেনঃ তুমি কি ভয় করছ আল্লাহ ও তার রাসূল তোমার প্রতি কোন অবিচার করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি অনুমান করলাম আপনি আপনার অন্য কোন বিবির নিকটে গিয়েছেনতিনি বললেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা মধ্য শা'বানে (১৫ তারিখের রাতে) দুনিয়ার কাছের আকাশে অবতীর্ণ হনতারপর কালব গোত্রের বকরী পালের লোমের চেয়েও বেশী সংখ্যক লোককে তিনি মাফ করে দেন[সুনান ইবনু মাজাহ হা/নং ১৩৮৯, সুনান আত তিরমিজী হা/নং ৭৩৯ তাহক্বীক আলবানী : যঈফ (দুর্বল)]।


পর্যালোচনা : এই হাদীসটি বায়হাকীতে মুরসাল সনদে বর্ণিত হয়েছে যা সকল হাদীস বিশারদগণের নিকট সর্বসম্মতিক্রমে অগ্রহণযোগ্য তথা আবূ ঈসা বলেন, হাজ্জাজের বরাতে এই সূত্রটি ব্যতীত অন্য কোন সূত্রে আইশা (রাঃ)-এর হাদীসটি প্রসঙ্গে আমরা কিছুই অবগত নইআমি মুহাম্মাদ আল-বুখারীকে উল্লেখিত হাদীসকে দুর্বল বলতে শুনেছিতিনি বলেছেন, রাবী ইয়াহইয়া ইবনু আবূ কাসীর উরওয়া (রহঃ) হতে কোন হাদীস শুনেননিমুহাম্মাদ আল-বুখারী আরও বলেন, এমনিভাবে হাজ্জাজও ইয়াহইয়া ইবনু আবূ কাসীরের নিকট হতে কিছুই শুনেননি

১১. لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانْ (লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান) তথা শাবানের মধ্য রজনীর ব্যাপারে সহীহ হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছেঃ

প্রশিদ্ধ জন সাহাবা থেকে কাছাকাছি সহীহ, হাসান সনদে একটি হাদীস বর্ণিত রয়েছে তন্মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো : আবূ মূসা আশআরী (রাঃ), মু‘আজ ইবনু জাবাল (রা) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন : إِنَّ اللَّهَ لَيَطَّلِعُ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ মহান আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন [সুনান ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৪৪৫; বায্যার, আল-মুসনাদ ১/১৫৭,২০৭, ৭/১৮৬; আহমাদ ইবনু হাম্বাল, মুসনাদ ২/১৭৬; ইবনু আবি আসিম; আস-সুন্নাহ পৃঃ ২২৩-২২৪; ইবনু হিব্বান; আস-সহীহ ১২/৪৮১; তাবরানী, আল-মুজাম আল-কাবীর ২০/১০৮, ২২/২২৩;আল-মুজাম আল-আওসাত ৭/৬৮; বায়হাক্বী, শুআবুল ঈমান ৩/৩৮১; ইবনু খুযায়মা, কিতাবুত তাওহীদ ১/৩২৫-৩২৬; ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির-হাদীসের নামে জালিয়াতি পৃঃ ৫৩৫]।


* আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী (রঃ) বলেছেন : শবে বরাতের সকল হাদীস দুর্বল ভিত্তিহীন
* কোন কোন আলেম বলেছেন যে, শবে বরাতের ব্যাপারে বর্ণিত কিছু দুর্বল হাদীসের উপর ভিত্তি করে সিরিয়ার তাবিয়িগণ শাবানের মধ্য রজনীতে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন নফল ইবাদত করতেন
* ব্যক্তিগত ইবাদতের জন্য মসজিদে সমবেত হওয়ার প্রয়োজন নেই বরং ব্যক্তিগত ইবাদতের জন্য বাসা-বাড়ীই হচ্ছে উত্তম কেননা রাসূল (সাঃ) নফল সালাত বাসা-বাড়ীতে আদায়ের উৎসাহ দিয়ে বলেছেন : لا تجعلوا بيوتكم مقابرا – ولا تجعلوا قبوركم مساجدا তোমরা কবরস্থানে সালাত আদায় করোনা এবং বাসা-বাড়ীকে কবরে পরিণত করোনা [সুনান আবু দাউদ হা/নং ২০৪২, সুনান আহমাদ হা/নং ৮৭৯০]।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এতটুকু প্রতিয়মান হয় যে, শাবানরে মধ্য রজনীতে কেহ যদি নিজ বাসা-বাড়ীতে বা ঘরে অন্যান্য দিনের ন্যায় ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত-বন্দেগী করে তাহলে এটা বিদআত হবেনা কিন্তু নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করলে ইসলাম বহির্ভূত, সুন্নাহ বিরোধী বিদআতে পরিণত হবে কারণ নিয়ম হলো, যে আমল যেখানে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে সে আমল সেখানে সেভাবে আদায় করা সুন্নাহ আর যা রাসূল (সাঃ) থেকে প্রমাণিত নেই তা পালন না করা সুন্নাহ তাই যে কোন বিষয়ই যেন শরীয়ত বিরোধী না হয় সে দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে

১২. তথাকথিত বরাত কেন্দ্রিক পালনীয় বর্জনীয় বিষয়সমূহঃ
. তথাকথিত বরাত কেন্দ্রিক করনীয় পালনীয় বিষয়সমূহঃ
* রামাদান মাসের রোযা অন্যান্য আমলের জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা
* দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত আদায় করা
* অন্যান্য সুন্নাহ নফল সালাতসমূহ আদায় করা
* প্রতি মাসে চাঁদের ১৩, ১৪ ১৫ তারিখের রোযা রাখা
* কুরআন সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক আমল করা
* দু পড়া : اَللَّهُمَّ بَلِّغْنَا رَمَضَانْ (আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান) হে আল্লাহ আপনি আমাদেরকে রামাদান পর্যন্ত পৌছে দিন। [ফাযায়েলে রামাদান হা/নং ০১, তাবারী মু‘জামুল আওসাত্ব হা/নং ৩৯৩৯]।

. তথাকথিত বরাত কেন্দ্রিক নিন্দনীয় বর্জনীয় বিষয়সমূহঃ
* বরাত কেন্দ্রিক সব আনুষ্ঠানিকতা পরিহার পরিত্যাগ করা
* আলোকসজ্জা, আতশবাজী, পটকা ফুটানো মোমবাতি জ্বালানো, হালুয়া-রুটি খাওয়া বিতরণ না করা
* কুরআন সহীহ সুন্নাহ বিরোধী সকল ভ্রান্ত মতবাদ, রসম-রেওয়াজ, বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতা না করা
* দুর্বল, মিথ্যা, জাল, বানোয়াট হাদীসের উপর আমল না করা
* কবর যিয়ারত, মাযারপূজাসহ মনগড়া সব আমল পরিহার করা

১২. উপসংহারঃ
উদারমানসিক বন্ধুগণ! আমাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে যে, শবে বরাতে ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়না বরং ভাগ্য নির্ধারণ করা হয় লাইলাতুল ক্বদরে আর মহান আল্লাহ শুধুমাত্র শবে বরাতের রাতেই পৃথিবীর প্রথম আকাশে অবতরণ করেন না বরং প্রতিদিনই পৃথিবীর প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং আহ্বান করতে থাকেন
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ – متفق عليه
আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন যে, আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাত্রে যখন এক তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে তখন দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন অতঃপর বলতে থাকেন- কে আমার নিকট দু করবে আমি তার দু কবুল করব, কে আমার নিকট কিছু চাইবে আমি তাকে প্রদান করব, কে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে আমি ক্ষমা করব  [বুখারী হা/নং ১১৪৫, মুসলিম হা/নং ৭৫৮, তাহাজ্জুদ অধ্যায় মাকতাবায়ে শামেলা ৪/২২৭, ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ]।

অনুরূপভাবে শবে বরাতই দু কবুলের একমাত্র রাত নয় বরং প্রতি রাতরে শেষাংশ দু কবুলের জন্য বিশেষিত তাই আসুন আমরা আল-কুরআন, রাসূল (সাঃ)-এর সহীহ হাদীস সহীহ আক্বীদা এবং সাহাবাদের আমলের মাধ্যমে জীবন-যাপন করি আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিদআত কু-সংস্কারমুক্ত কুরআন-সহীহ হাদীস ভিত্তিক জীবন-যাপনের তাওফীক্ব দান করুন, আমীন

নির্ঘন্ট / গ্রন্থপঞ্জি
. তাফসীর ইবনে কাসীর       
. তাফসীর কুরতুবী
. . আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর-হাদীস নামের জালিয়াতি এবং শবে বরাত
. আকরামুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম-শবে বরাতের সমাধান
. শবে বরাত সংক্রান্ত বিভিন্ন পুস্তক