Sunday, 24 November 2019

মুসলিম মনীষা পরিচিতি : বাদশাহ ফয়সাল ; পরিবর্তন ও সংস্কারধর্মী লড়াকু শাসক এবং সহিহ আকিদার এক উজ্জল নক্ষত্র


মুসলিম মনীষা পরিচিতি : 
বাদশাহ ফয়সাল ; পরিবর্তন ও সংস্কারধর্মী লড়াকু শাসক 
এবং সহিহ আকিদার এক উজ্জল নক্ষত্র
আব্দুস সালাম হুসাইন আলী

 

১. পরিচিতি ও জন্মঃ

বিশ্বব্যাপী কালজয়ী অন্যতম মুসলিম শাসক, পরিবর্তনকামী সংস্কারধর্মী লড়াকু শাসক ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ। তিনি ১৯০৬ সালের ১৪ এপ্রিল ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ১১ বছর সৌদি শাসনের দায়িত্বপালন করেছেনবাদশাহ হিসেবে তিনি দেশের ধর্মীয় কুসংস্কারমুক্তকরণ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং আধুনিকীকরণ ও সংস্কারে সফল হনতার বৈদেশিক নীতির মূল দিক ছিল প্যান ইসলামিজম (হল মুসলিমদের ঐক্যকেন্দ্রিক একটি রাজনৈতিক আন্দোলন), কমিউনিজম বিরোধিতা, ফিলিস্তিনি দাবির সমর্থন তিনি দেশের আমলাতন্ত্রকে সফলভাবে সংহত করেনসৌদিদের জনপ্রিয় শাসক।

 

০২. ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ-এর কৃতত্ব ও সাফল্যঃ

২/১. ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৪ বছরের কিশোর-বয়েসে বাবার রাজনৈতিক প্রতিনিধি হয়ে ইউরোপ সফর করেন আর এটাই রাজপরিবারের কোনো সদস্যের প্রথম ইউরোপ সফর ছিল।

২/২. বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ যদিও রাজতন্ত্রের শাসক ছিলেন, কিন্তু মুসলিম বিশ্বের ঐক্যপ্রচেষ্টা, উন্নতি ও ইসরায়েল-বিরোধিতায় অবদানের জন্য তিনি যেমন মুসলিম বিশ্বের কাছে প্রশংসিত ও শ্রদ্ধার পাত্র, তেম্নি সেকেলে সৌদি রেওয়াজ ও নানামাত্রিক কুসংস্কার দূর করে উন্নত দেশ গড়ার প্রচেষ্টার কারণে সৌদি সমাজেও অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।
২/৩. মাত্র ১৬ বছর বয়েসে হাইল ও আসিরের দুটো যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ফয়সাল
২/৪. বাদশাহ আবদুল আজিজ ছেলের দক্ষতা ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে হেজাজের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন
২/৫. ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
২/৬. ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ তাঁরই প্রচেষ্টা ও উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা লাভ করে
২/৭. হাজার বছর ধরে চলে আসা দাসপ্রথার বিলুপ্তিও তাঁর মাধ্যমেই সংঘটিত হয়
২/৮. ১৯৬৯ সালে ২৫টি মুসলিম রাষ্ট্র নিয়ে ‘ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসা রক্ষার্তে’ ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন) প্রতিষ্ঠা করেন।

০৩. সহিহ আকিদার আদর্শ ব্যক্তিত্ব ও জ্বলন্ত এক প্রতীক :
ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ ছিলেন সহিহ আকিদার আদর্শ ব্যক্তিত্ব ও জ্বলন্ত এক প্রতীক। যার জীবনের অবিস্মরণীয় ও বিরল এক ঘটনা সেই দিকেই ইঙ্গিত করে। যথা :
বাদশাহ ফয়সাল (রাহিমাহুল্লাহ) ... পাকিস্তান সফরে যাওয়ার পর জুলফিকার আলি ভূট্টো তাঁকে নিয়ে যান মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর কবরের কাছে উঁচু ও শ্বেতপাথরে বাঁধানো জাঁকজমকপূর্ন কবর ভূট্টো নিজে জিন্নাহর কবরকে স্যালুট করলেন ও বাদশাহকেও করতে বললেন বাদশাহ তার কারন জিজ্ঞেস করলে ভূট্টো বলেন, এটা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর কবর এখানে সম্মান প্রদর্শন করতে হয়

বাদশাহ ফয়সাল (রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, "মিঃ ভূট্টো, কবরকে স্যালুট করা যদি ইসলামে জায়েজ থাকতো, তবে তোমার কাছে আছে জিন্নাহর কব, আর আমার কাছে আছে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর কবর। যদি তা জায়েজই থাকতো, তাহলে আমি তা স্বর্ণ দিয়ে মুড়িয়ে দৈনিক পাঁচবার সিজদাহ করতাম, কিন্তু আফসোস, তা ইসলামে নিষিদ্ধ "। আল্লাহু আকবার।

০৪. ইন্তেকালঃ
বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজকে তাঁর সৎ ভাইয়ের ছেলে চরম বিশ্বাস ঘাতক ‘ফয়সাল বিন মুসাইদ’ ২৫ মার্চ ১৯৭৫ সালে ছোড়া গুলিতে নিহত হন।

[তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া ; ইন্টারনেট ভিত্তিক উন্মুক্ত বিশ্বকোষ।]

Friday, 22 November 2019

মানুষ কি মাতৃগর্ভ থেকে কুরআন হিফয করে এবং অলী হয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে?


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
মানুষ কি মাতৃগর্ভ থেকে কুরআন হিফয করে 
এবং অলী হয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে?
আব্দুস সালাম হুসাইন আলী


০১. প্রারম্ভিকা ও প্রশ্ন :
মানুষ কি মাতৃগর্ভ থেকে কুরআন হিফয করে এবং অলী হয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে? সমাজে কথিক রয়েছে যে, ‘আব্দুল কাদির জিলানী মাতৃগর্ভ থেকে ১৮ পারা কুরআন হিফয করে জন্মগ্রহণ করেছেনএ কথার আদৌ কি কোন ভিত্তি আছে-না অসাঢ়, মূখরোচ ভ্রান্ত মতবাদেই সিমাবদ্ধ? আসুন তাহলে ইসলামের কষ্টিপাথরে যাচাই করে, কুরআন ও হাদীসের মানদন্ডে নিরূপণ করে বিস্তারিত জেনে নেই

০২. উত্তর :
উপরোক্ত কথিত কথাটি একটি ভ্রান্ত মতবাদইহা বিশ্বাস করা কুরআন ও হাদীস অস্বীকারের নামান্তরএ ধরণের ভ্রান্ত কথা ও মতবাদ থেকে আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে ইসলামের সঠিক আকিদা পোষণ করতে হবে কেননা একথা চূলছেড়া গভীর বিশ্লেষণের দাবী রাখে যে, প্রত্যেক মানুষকে তার রবের প্রতি চারটি কারণে কৃতজ্ঞ থাকতে হবেযথা :
ক. অনস্তিত্বশীল জড়পদার্থ থেকে মানুষকে আল্লাহ অস্তিত্বশীল ভাষা ব্যবহারকারী উত্তম প্রাণীতে রূপান্তর করেছেন
খ. সর্বোত্তম অবয়ব ও গঠন প্রণালী দিয়ে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সুনীপনতা ও কারুকার্যের মাধূরি দিয়ে মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন
গ. অথর্ব, গর্দভ, বিকারগ্রস্থ, অকেজো, ব্রেইন না দিয়ে, পাগল-উন্মাদ না বানিয়ে সুস্থ্য-সুন্দর দেহ-মন, মেধা ও প্রতিভা সম্পন্ন মানুষ বানিয়েছেন
ঘ. মহা প্রাচুর্য্যশীল, দৌলত সম্পন্ন ঈমান নামক মহাদৌলত ও নিয়ামত দিয়ে মুমিন বানিয়েছেন সুতরাং উপরোক্ত আকিদা পোষণের মাধ্যমে ঈমান হারা হওয়া থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

০৩. তথ্য-প্রমাণ :
মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা এরশাদ কেরছেন :
﴿وَاللهُ أَخْرَجَكُم مِّنۢ بُطُونِ أُمَّهٰتِكُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ شَيْـًٔا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصٰرَ وَالْأَفْـِٔدَةَ ۙ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
আর আল্লাহ তোমাদেরকে নির্গত করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ হতে এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতেনা, এবং তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং হৃদয়, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’ [সূরা নাহল : ৭৮]।

০৪. তাফসীল ; ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ :
৪/১. তাফসীর আহসানুল বায়ান :
ক. আয়াতে شيئا অনির্দিষ্টঅর্থাৎ, তোমরা কিছুই জানতে নানা ভাল-মন্দ, আর না লাভ-নোকসান
খ. اَلسَّمْعَ যাতে কান দ্বারা তোমরা শব্দ শুনতে পারো, وَالْأَبْصٰرَ  চোখ দ্বারা সকল জিনিস দেখতে পারোوَالْأَفْـِٔدَةَ  আর অন্তর অর্থাৎ, জ্ঞান (কেননা অন্তর জ্ঞানের কেন্দ্রস্থল) দান করেছেন, যাতে নানা জিনিসের মধ্যে পার্থক্য করতে পারো, লাভ-ক্ষতি বুঝতে পারোমানুষ ধীরে ধীরে যত বড় হয়, তার জ্ঞান-বুদ্ধি ও শক্তি বাড়তে থাকেএমন কি যখন সে পূর্ণ বয়সে (পূর্ণ যৌবনে) পদার্পণ করে, তখন তার ঐ সকল শক্তিও পরিপূর্ণতা লাভ করে

গ.
تَشْكُرُونَ لَعَلَّكُمْ এই সকল শক্তি মহান আল্লাহ এই জন্য দান করেছেন, যাতে মানুষ এই সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এমনভাবে ব্যবহার করবে, যাতে আল্লাহ খুশি হনতা দিয়ে আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদত করবেএটিই হল আল্লাহর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতাহাদীসে কুদসীতে বর্ণিত, মহান আল্লাহ বলেন, "আমার বান্দা যে সব জিনিস দিয়ে আমার নৈকট্য লাভ করে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় হল আমি যা তাদের উপর ফরয করেছিতাছাড়া নফল ইবাদত দ্বারাও সে আমার অধিক নৈকট্য লাভে সচেষ্ট হয়পরিশেষে আমি তাকে ভালবাসতে শুরু করিআর যখন আমি তাকে ভালবাসতে শুরু করি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে, তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলেসে চাইলে তাকে দান করি, আশ্রয় চাইলে তাকে আশ্রয় দিই।" [বুখারীঃ কিতাবুর রিক্বাক]।

কিছু লোক এই হাদীসের ভুল অর্থ নিয়ে আল্লাহর অলীদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত শক্তির মালিক বলে মনে করেঅথচ হাদীসের স্পষ্ট অর্থ হল যে, যখন বান্দা আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে নিষ্ঠাবান হয়তখন তার প্রতিটি কর্ম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়ে থাকেসে তার কান দিয়ে ঐ কথাই শোনে, চোখ দিয়ে ঐ জিনিসই দেখে, যাতে আল্লাহর অনুমতি আছেযে জিনিস হাত দিয়ে ধরে বা যে পথে চলে, তা শরীয়ত সমর্থিতআল্লাহর অবাধ্যতায় তা ব্যবহার করে না; বরং তা একমাত্র তাঁর আনুগত্যে ব্যবহার করে

৪/২. তাফসীর যাকারিয়া :
অর্থাৎ এমন সব উপকরণ যার সাহায্যে তোমরা দুনিয়ার সব রকমের জ্ঞান ও তথ্য সংগ্রহ করে দুনিয়ার যাবতীয় কাজ কর্ম চালাবার যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছোজন্মকালে মানব সন্তান যত বেশী অসহায় ও অজ্ঞ হয় এমনটি অন্য কোন প্রাণীর ক্ষেত্রে হয় নাকিন্তু শুধুমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের উপকরণাদির (শ্রবণ শক্তি, দৃষ্টিশক্তি, বিবেক ও চিন্তাশক্তি) সাহায্যেই সে উন্নতি লাভ করে পৃথিবীর সকল বস্তুর ওপর প্রাধান্য বিস্তার এবং তাদের ওপর রাজত্ব করার যোগ্যতা অর্জন করেআয়াতের শেষে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অর্থ, এগুলোকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিতে কাজে লাগানোসুতরাং আল্লাহর সন্তুষ্টি যাতে হয় তাই শুধু সে করবেএক হাদীসে এ ব্যাপারটি স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “মহান আল্লাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি আমার কোন অলীর সাথে শক্রতা পোষণ করে আমি তার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দিলামআমার বান্দার উপর যা আমি ফরয করেছি তা ছাড়া আমার কাছে অন্য কোন প্রিয় বস্তু নেই যার মাধ্যমে সে আমার নৈকট্য লাভ করতে পারেআমার বান্দা আমার কাছে নফল কাজসমূহ দ্বারা নৈকট্য অর্জন করতেই থাকে, শেষ পর্যন্ত আমি তাকে ভালবাসিতারপর যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার শ্রবণশক্তি হয়ে যাই যার দ্বারা সে শুনে, তার দৃষ্টি শক্তি হয়ে যাই যার দ্বারা সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যার দ্বারা সে ধারণ করে আর তার পা হয়ে যাই যার দ্বারা সে চলেতখন আমার কাছে কিছু চাইলে আমি তাকে তা অবশ্যই দেব, আমার কাছে আশ্রয় চাইলে আমি তাকে অবশ্যই উদ্ধার করব"[বুখারীঃ ৬৫০২]

হাদীসের অর্থ হচ্ছে, বান্দাহ যখন একমাত্র আল্লাহর আনুগত্য করে এবং যাবতীয় কাজ আল্লাহর জন্যই করে, তখন তার সমস্ত কর্মকাণ্ড একমাত্র আল্লাহর জন্য হয়ে যায়সে তখন এর বাইরে চলতে পারে নাসে যা শোনে তা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই শোনেযা দেখে তা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই দেখে, অর্থাৎ তার শরীআতের অনুমোদন ছাড়া কিছুই দেখে নাঅনুরূপভাবে তার যাবতীয় চলা-ফেরা, ধর-পাকড় কেবলমাত্র আল্লাহর আনুগত্য অনুসারে হয়তার সাহায্যেই অনুষ্ঠিত হয়আর যখন বান্দা এরকম হয়, তখন আল্লাহও তার ডাকে সাড়া দেনতার যাবতীয় কাজ সফল হতে থাকেবস্তুত: আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার কাছে সবসময়ই চায় তার বান্দাগণ তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেঅন্য আয়াতেও সে কথা বর্ণনা করা হয়েছে

যেমন, “বলুন, তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তকরণতোমরা খুব অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবলুন, তিনিই যমীনে তোমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং তারই কাছে তোমাদেরকে সমবেত করা হবে[সূরা আল-মুলকঃ ২৩-২৪] [ইবন কাসীর]

৪/. তাফসীর ফাতহুল মাজীদ :
ক. অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মানুষকে মায়ের পেট থেকে এমন অবস্থায় বের করে আনেন যে, সে অবস্থায় তার কোন জ্ঞান থাকে নাকোনটা ভাল-মন্দ, কোনটা সঠিক, কোনটা বেঠিক ইত্যাদি সম্পর্কে থাকে একেবারেই অজ্ঞকিন্তু সৃষ্টির সময় আল্লাহ তাআলা কান, চোখ ও অন্তর দিয়ে দিয়েছেন যাতে কান দ্বারা শোনে, চোখ দ্বারা দেখে এবং অন্তর দ্বারা উপলদ্ধি করে জ্ঞান অর্জন করতে পারেমানুষ যখন ধীরে ধীরে বড় হয় তখন তার সব কিছু বাড়তে থাকে এবং দৈহিক শক্তি ও জ্ঞানের পরিমাণও বাড়তে থাকে

আল্লাহ তাআলা বলেন :
﴿قُلْ هُوَ الَّذِيْٓ أَنْشَأَكُمْ وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ قَلِيْلًا مَّا تَشْكُرُوْنَ -‏ قُلْ هُوَ الَّذِيْ ذَرَأَكُمْ فِي الْأَرْضِ وَإِلَيْهِ تُحْشَرُوْنَ
বল: তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তঃকরণতোমরা অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকবল: তিনিই পৃথিবীব্যাপী তোমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁরই কাছে তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে[সূরা মুলক ৬৭:২৩-২৪]।

৫. আয়াত ও হাদীস হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
ক. আল্লাহ তাআলা মানুষকে অস্তিত্বহীন থেকে সৃষ্টি করেছেন।
খ. জন্মগ্রহণের সময় কথিত কুরআন হিফয করে এবং অলী হয়ে জন্মগ্রহণ করা ভ্রান্ত মতবাদ।
গ. আল্লাহ তাআলার নিকট সকল কিছুর জ্ঞান রয়েছে

৬. উপসংহার :
প্রত্যেক মানুষকে তার রবের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে ভিত্তিহীন, অসাঢ়, মূখরোচ ভ্রান্ত কথা, মতবাদ ও বিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে সঠিক ধর্মবিশ্বাস তথা আকিদা পোষণ করতে হবে। আর জীবনের সর্বক্ষেত্রে চূলছেড়া গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইসলামের কষ্টিপাথরে যাচাই করে, কুরআন ও হাদীসের মানদন্ডে নিরূপণ করে আমল করতে হবে। আন্তরিকপূর্ণ তাওবার মাধ্যমে ইসলামের সু-শীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাসূল (সাঃ)-এর পরিপূর্ণ অনুসরণ, অনুকরণের মাধ্যমে আমল করে জান্নাতি হওয়ার তাওফীক দান করুন, আমীন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রসংশায় ক্বাসীদা (আরবি কবিতা) :


قَصِيْدَةُ فِيْ مَدْحِ رَسُوْلِ اللهِ صَلّٰى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রসংশায় ক্বাসীদা (আরবি কবিতা) :


مُحَمَّدٌ سَيِّدُ الْكَوْنَيْنِ وَالثَّقَلَيْنِ 
وَالْفَرِيْقَيْنِ مِنْ عَرَبٍ وَمِنْ عَجَمِ
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, দু’জাহানের মহান নেতা
আরব-আজম অধিপতি, বিশ্বগুরু জগত জেতা।

هُوَ الْحَبِيْبُ الَّذِيْ تُرْجٰى شَفَاعَتُهُ 
لِكُلِّ هَوْلٍ مِّنَ الْأَهْوَالِ مُقْتَحِمِ
প্রিয় সখা খোদ এলাহির, পরকালের কান্ডারী সে
কঠোর কঠিন বিপদকালে, মুক্তি দয়ার ভান্ডারী সে।

بُشْرٰى لَنَا مَعْشَرَ الإِسْلَامِ إِنَّ لَنَا 
مِنَ الْعِنَايَةِ رُكْنًا غَيْرَ مُنْهَدَمِ
ভাগ্য দারাজ এ মিল্লাতের, আল্লাহর প্রিয় রাসূল আল-আমীন
করলো কায়েম এমন খুঁটি, ধ্বংস যাহার নেই কোনো দিন।

সীরাতুর রাসূল (সাঃ)। পর্ব : সাত। রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি দুরূদ ও সালাত পাঠ করাঃ


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
সীরাতুর রাসূল (সাঃ)। পর্ব : সাত
রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি দুরূদ ও সালাত পাঠ করাঃ
সংকলনে : আব্দুস সালাম হুসাইন আলী

০১. ভূমিকাঃ
রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি দুরূদ ও সালাত পাঠ করা মুসলিমের জন্য নবী প্রেমিকের বহিঃপ্রকাশ এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত-বরকত ও ক্ষমা পাওয়া এবং সম্মান বৃদ্ধির মাধ্যমও বটে।

০২. আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন :
﴿إِنَّ اللَّهَ وَمَلٰٓئِكَتَهُۥ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِىِّ ۚ يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
আল্লাহ নাবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর মালাইকারাও নাবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করেহে মুমিনগণ! তোমরাও নাবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও [সূরা আহযাব : ৫৬]।

০৩. হাদীস :
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিততিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
مَنْ صَلَّى عَلَىَّ صَلاَةً وَاحِدَةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ عَشْرَ صَلَوَاتٍ وَحُطَّتْ عَنْهُ عَشْرُ خَطِيئَاتٍ وَرُفِعَتْ لَهُ عَشْرُ دَرَجَاتٍ
যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করবে আল্লাহ তাআলা তার উপর দশবার রহমত নাযিল করবেন, তার দশটি শুনাহ মিটিয়ে দেওয়া হবে এবং তাঁর জন্য দশটি মর্যাদা উন্নীত করা হবে[সুনান নাসাঈ ১৩০০ (ই. ফা)]।

 ০৪. ব্যাখ্যা :
৩/১. তাফসীর আহসানুল বায়ান :
এই আয়াতে নবী (সাঃ)-এর ঐ সম্মান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যা আসমানে উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ফিরিশতাগণের নিকট বিদ্যমানতা এই যে আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাগণের নিকট নবী (সাঃ)-এর সুনাম ও প্রশংসা করেন এবং তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতাগণও নবী (সাঃ) এর উচ্চমর্যাদার জন্য দু'আ করেনতার সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা বিশ্ববাসীদেরকেও আদেশ করেছেন, যেন তারাও নবী (সাঃ)-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করেযাতে নবী (সাঃ)-এর প্রশংসায় ঊর্ধ্ব ও নিম্ন দুই বিশ্ব একত্রিত হয়ে যায়হাদীসে বর্ণনা হয়েছে যে, সাহাবায়ে কিরামগণ আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সালামের নিয়ম তো আমাদের জানা আছে (অর্থাৎ তাশাহহুদে 'আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান্নাবিয়্যু' পড়ি) কিন্তু আমরা দরূদ কিভাবে পড়ব? এর উত্তরে তিনি দরূদে ইবরাহিমী -- যা নামাযে পাঠ করা হয় তা বর্ণনা করলেন [বুখারীঃ তাফসীর সূরা আহ্যাব]।

এ ছাড়া হাদীসে দরূদের আরো অন্য শব্দ বর্ণিত হয়েছে, সেগুলিও পাঠ করা চলবেসংক্ষেপে (صَلَّى اللهُ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ وَسَلَّم) পাঠ করা যাবেপক্ষান্তরে (اَلصَّلَوةُ وَالسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ) পাঠ করা এই জন্য ঠিক নয় যে, এতে নবী (সাঃ)-কে সরাসরি সম্বোধন করা হয় এবং এই শব্দগুচ্ছ সাধারণ দরূদে নবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত হয়নিআর যেহেতু তাশাহহুদে 'اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ اَيُّهَا النَّبِيُّ' শব্দ নবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে সেহেতু (তাশাহহুদে তা পাঠ করাতে কোন দোষ নেইতা ছাড়া (اَلصَّلَوةُ وَالسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ) পাঠকারী এই বাতিল বিশ্বাস নিয়ে পাঠ করে যে, নবী (সাঃ) তা সরাসরি শ্রবণ করেনএই বাতিল বিশ্বাস কুরআন ও হাদীসের পরিপন্থীসুতরাং এই আকীদা নিয়েও নিজেদের মনগড়া দরূদ পাঠ করা ঠিক নয়অনুরূপ আযানের পূর্বে তা পাঠ করাও বিদআত, যাতে সওয়াব নয়; বরং গুনাহ হয়হাদীসে দরূদের বড় গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছেনামাযে তা পাঠ করা ওয়াজেব না সুন্নত? অধিকাংশ উলামাগণ বলেছেন সুন্নত এবং ইমাম শাফেয়ী ও আরো অনেকে তা ওয়াজেব বলেছেনতবে একাধিক হাদীসে তার ওয়াজেব হওয়ারই সমর্থন পাওয়া যায়অনুরূপ হাদীস দ্বারা এটাও বোঝা যায় যে, যেমন শেষ তাশাহহুদে দরূদ পড়া ওয়াজেব তেমনই প্রথম তাশাহহুদেও দরূদ পাঠ করা ওয়াজেব

নিম্নে তার কতিপয় দলীল দেওয়া হলঃ-
প্রথম প্রমাণ এই যে, মুসনাদে আহমাদে সহীহ সানাদে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সালামের নিয়ম তো আমাদের জানা আছে (অর্থাৎ তাশাহহুদে 'আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান্নাবিয়্যু' পড়ি) কিন্তু আমরা নামাযে দরূদ কিভাবে পড়ব? এর উত্তরে তিনি দরূদে ইবরাহিমী শিক্ষা দিলেন [আল ফাতহুর রাববানী ৪/২০-২১]।

মুসনাদে আহমাদ ছাড়াও উক্ত হাদীস সহীহ ইবনে হিববান, সুনানে কুবরা বায়হাকী, মুস্তাদরাক হাকেম এবং ইবনে খুযায়মাতে বর্ণিত হয়েছেএতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, যেমন তাশাহহুদে সালাম পড়া হয় অনুরূপ উক্ত প্রশ্নও নামাযের ভিতরে দরূদ পাঠ সম্পর্কে ছিল, উত্তরে নবী (সাঃ) দরূদে ইবরাহিমী পড়ার আদেশ দিয়েছিলেনযাতে বোঝা যাচ্ছে যে, সালামের সাথে দরূদও পড়া দরকার এবং তা পড়ার স্থান হল তাশাহহুদআর হাদীসে তা সাধারণভাবে বর্ণনা হয়েছেপ্রথম বা দ্বিতীয় তাশাহহুদের সাথে নির্দিষ্ট করা হয়নিযার ফলে বলা যায় যে, প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় তাশাহহুদেই সালাম ও দরূদ পড়তে হবে

যে বর্ণনাগুলিতে প্রথম তাশাহহুদ দরূদ ছাড়া উল্লেখ হয়েছে সেগুলিকে সূরা আহযাবের আয়াত 'صَلُّوْا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوْا' অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের ধরা হবেকিন্তু উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর অর্থাৎ পঞ্চম হিজরীর পর যখন নবী (সাঃ) সাহাবায়ে কিরামগণের প্রশ্নের উত্তরে দরূদের শব্দও বর্ণনা করে দিলেন, তখন নামাযে সালামের সাথে দরূদ পড়াও জরুরী হয়ে গেল, চাহে তা প্রথম তাশাহহুদ হোক বা দ্বিতীয়

আরো একটি প্রমাণ হল, আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, "নবী (সাঃ) কখনো কখনো রাত্রে নয় রাকআত নামায পড়তেন, আট রাকআতে যখন তাশাহহুদে বসতেন, তখন তাতে তাঁর প্রভুর নিকট দু'আ করতেন এবং তাঁর পয়গম্বরের উপর দরূদ পড়তেন তারপর সালাম না ফিরে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং নয় রাকআত পূর্ণ করে পুনরায় তাশাহহুদে বসতেন, তাঁর প্রভুর নিকট দু'আ করতেন এবং তাঁর পয়গম্বরের উপর দরূদ পড়তেন এবং পুনরায় দু'আ করতেন, তারপর সালাম ফিরতেন [বায়হাকী ২/৭০৪, নাসাঈ ১/২০২, বিস্তারিত দেখুনঃ আল্লামা আলবানীর সিফাতু সালাতিন্নাবী ১৪৫ পৃষ্ঠা]।

উক্ত বর্ণনায় পরিষ্কার উল্লেখ আছে যে, নবী (সাঃ) তাঁর রাত্রের নামাযে প্রথম ও শেষ উভয় তাশাহহুদে দরূদ পড়েছেনএটা যদিও নফল নামাযের কথা ছিল; তবুও নবী (সাঃ)-এর উক্ত আমল দ্বারা উল্লিখিত ব্যাপক দলীলসমূহের সমর্থন হয়যার ফলে তা শুধু নফল নামাযের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়

৪/২. তাফসীর যাকারিয়া :
আরবী ভাষায় সালাত শব্দের অর্থ রহমত, দো'আ প্রশংসাঅধিকাংশ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর নবীর প্রতি যে সালাত সম্পৃক্ত করা হয়েছে এর অর্থ, আল্লাহ নবীর প্রশংসা করেনতার কাজে বরকত দেনতার নাম বুলন্দ করেনতার প্রতি নিজের রহমতের বারি বর্ষণ করেনফেরেশতাদের পক্ষ থেকে তার উপর সালাত প্রেরণের অর্থ হচ্ছে, তারা তাকে চরমভাবে ভালোবাসেন এবং তার জন্য আল্লাহর কাছে দো'আ করেন, আল্লাহ যেন তাকে সর্বাধিক উচ্চ মর্যাদা দান করেন, তার শরীয়াতকে প্রসার ও বিস্তৃতি দান করেন এবং তাকে সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে পৌঁছিয়ে দেনতার উপর রহমত নাযিল করেনআর সাধারণ মুমিনদের তরফ থেকে সালাতের অর্থ দো'আ ও প্রশংসার সমষ্টিএ আয়াতের তাফসীরে আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন: আল্লাহ তা'আলার সালাতের অর্থ আল্লাহ কর্তৃক ফিরিশতাদের সামনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান ও প্রশংসা করা[সহীহ বুখারী, কিতাবুত্তাফসীর]

আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মান দুনিয়াতে এই যে, তিনি ফিরিশতাদের কাছে তার কথা আলোচনা করেনতাছাড়া তার নামকে সমুন্নত করেনতিনি পূর্ব থেকেই তার নাম সমুন্নত করেছেনফলে আযান, ইকামত ইত্যাদিতে আল্লাহর নামের সাথে সাথে তার নামও শামিল করে দিয়েছেন, তার দ্বীন পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন, প্রবল করেছেন; তার শরীয়তের কাজ কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছেন এবং তার শরীয়তের হেফাযতের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করেছেনপক্ষান্তরে আখেরাতে তার সম্মান এই যে, তার স্থান সমগ্র সৃষ্টির উর্ধে রেখেছেন এবং যে সময় কোন নবী ও ফেরেশতার সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকবে না, তখনও তাকে সুপারিশের ক্ষমতা দিয়েছেন, যাকে মাকামে-মাহমুদবলা হয়মনে রাখা প্রয়োজন যে, রাসূলের উপর সালাত প্রেরণের ক্ষেত্রে সালাত শব্দ দ্বারা একই সময়ে একাধিক অর্থ (রহমত, দো'আ ও প্রশংসা) নেয়ার পরিবর্তে সালাত শব্দের এক অর্থ নেয়াই সঙ্গত অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মান, প্রশংসা ও শুভেচ্ছা[ইবনুল কাইয়্যেম, জালাউল আফহাম]

আয়াতের আসল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করার আদেশ দান করাকিন্তু তা এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, প্রথমে আল্লাহ স্বয়ং নিজের ও তাঁর ফেরেশতাগণের দরূদ পাঠানোর কথা উল্লেখ করেছেনঅতঃপর সাধারণ মুমিনগণকে দরূদ প্রেরণ করার আদেশ দিয়েছেন

অধিকাংশ ইমাম এ বিষয়ে একমত যে, কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম উল্লেখ করলে অথবা শুনলে দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব হয়ে যায়[কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]

কেননা, হাদীসে এরূপ ক্ষেত্রে দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব হওয়া বর্ণিত আছেরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: সেই ব্যক্তি অপমানিত হোক যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হলে সালাত পাঠ করে না[তিরমিয়ী: ৩৫৪৫] অন্য এক হাদীসে আছে- সেই ব্যক্তি কৃপণ, যার কাছে আমার নাম উচ্চারণ করা হলে দরূদ পাঠ করে না' [তিরমিয়ী: ৩৫৪৬]

নবী সাল্লাল্লাহ্ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্যের জন্য সালাতপেশ করা জায়েয কিনা, এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছেএকটি দল, কাযী ঈয়াদের নাম এ দলের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, একে সাধারণভাবে জায়েয মনে করেএদের যুক্তি হচ্ছে, কুরআনে আল্লাহ নিজেই অ-নবীদের ওপর একাধিক জায়গায় সালাতের কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেনএভাবে নবী সাল্লাল্লাহ্ আলাইহি ওয়া সাল্লামও একাধিকবার অ-নবীদের জন্য সালাত শব্দ সহকারে দো'আ করেনযেমন একজন সাহাবীর জন্য তিনি দো'আ করেন, হে আল্লাহ! আবু আওফার পরিজনদের ওপর সালাত পাঠাওজাবের ইবনে আবদুল্লাহর রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রীর আবেদনের জবাবে বলেন, আল্লাহ তোমার ও তোমার স্বামীর ওপর সালাত পাঠানযারা যাকাত নিয়ে আসতেন তাদের পক্ষে তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! ওদের উপর সালাত পাঠাওসা'দ ইবনে উবাদার পক্ষে তিনি বলেন, হে আল্লাহ! সা'দ ইবন উবাদার পরিজনদের ওপর তোমার সালাত ও রহমত পাঠাওআবার মুমিনের রূহ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খবর দিয়েছেন যে, ফেরেশতারা তার জন্য সালাত পাঠ করেকিন্তু মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশের মতে এমনটি করা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্য তো সঠিক ছিলকিন্তু আমাদের জন্য সঠিক নয়তারা বলেন, সালাত ও সালামকে মুসলিমরা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছেএটি বর্তমানে তাদের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছেতাই নবীদের ছাড়া অন্যদের জন্য এগুলো ব্যবহার না করা উচিতএ জন্যই উমর ইবনে আবদুল আযীয একবার নিজের একজন শাসনকর্তকে লিখেছিলেন, “আমি শুনেছি কিছু বক্তা এ নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করতে শুরু করেছেন যে, তারা আস-সালাতু আলান নাবী'-এর মতো নিজেদের পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারীদের জন্যও সালাতশব্দ ব্যবহার করেছেনআমার এ পত্র পৌঁছে যাবার পরপরই তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং সালাতকে একমাত্র নবীদের জন্য নির্দিষ্ট করে অন্য মুসলিমদের জন্য দো'আ করেই ক্ষান্ত হবার নির্দেশ দাও[রূহুল-মা'আনী]

এ হুকুমটি নাযিল হবার পর বহু সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সালামের পদ্ধতি তো আপনি আমাদের বলে দিয়েছেন। (অর্থাৎ নামাযে "আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবীইয়্যু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহএবং দেখা সাক্ষাত হলে "আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ" বলা।) কিন্তু আপনার প্রতি সালাত পাঠাবার পদ্ধতিটা কি? [দেখুন,তাবারী,কুরতুবী,তাহরীর ওয়া তানওয়ীর] এর জবাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন লোককে বিভিন্ন সময় যেসব সালাত বা দরূদ শিখিয়েছেন তা বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছেযেমন :

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
[বুখারীঃ ৩৩৬৯, ৬৩৬০, ৯৭৯]

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
[বুখারীঃ ৩৩৭০]


اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ
[বুখারীঃ ৪৭৯৮]

اللّٰهُمَّ صَلِّ عَلٰى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الأُمِّيِّ وَعَلٰى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلٰى إِبْرَاهِيْمَ وَآلِ إِبْرَاهِيْمَ وَبَرِكْ عَلٰى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الأُمِّيِّ كَمَا بَارَكْتَ عَلٰى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلٰى آلِإِبْرَاهِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ
[মুসনাদে আহমাদঃ ৪/১১৯]

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরূদ পড়ার ফযীলত সংক্রান্ত অনেক হাদীস রয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে ফেরেশতারা তার প্রতি দরূদ পাঠ করে যতক্ষণ সে দরূদ পাঠ করতে থাকে[মুসনাদে আহমাদ:৩/৪৪৫, ইবনে মাজাহ: ৯০৭] আরো বলেছেন, “যে আমার ওপর একবার দরূদ পড়ে আল্লাহ তার ওপর দশবার দরূদ পড়েন” [মুসলিম: ৩৮৪] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমার সাথে থাকার সবচেয়ে বেশী হকদার হবে সেই ব্যক্তি যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশী দরূদ পড়বে[তিরমিয়ী: ৪৮৪] আরো বলেছেন, আমার কথা যে ব্যক্তির সামনে আলোচনা করা হয় এবং সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করে না সে কৃপণ[তিরমিযী: ৩৫৪৬]।

৪/৩. তাফসীর ফাতহুল মাজীদ :
বলেন: (নাবীর প্রতি) আল্লাহ তাআলার সালাত হলো: ফেরেশতাদের কাছে তাঁর প্রশংসা করাআর ফেরেশতাদের সালাত হলো: নাবীর জন্য দুআ করা। (সহীহ বূখারী, অত্র আয়াতের তাফসীর).এ আয়াতে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ঐ সম্মান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যা আসমানে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ফেরেশতাদের নিকট বিদ্যমানতা এই যে, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের নিকট নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সম্মান ও প্রশংসা করেন এবং তাঁর ওপর রহমত বর্ষণ করেনআর ফেরেশতাগণও নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মর্যাদার জন্য দুআ করেনতার সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা বিশ্ববাসীকে আদেশ করছেন তারাও যেন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করেযাতে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রশংসায় ঊর্ধ্ব ও নিম্ন উভয় জগৎ একত্রিত হয়ে যায়আবুল আলিয়া (রা.) বলেন: (নাবীর প্রতি) আল্লাহ তাআলার সালাত হলো: ফেরেশতাদের কাছে তাঁর প্রশংসা করাআর ফেরেশতাদের সালাত হলো: নাবীর জন্য দুআ করা[সহীহ বূখারী, অত্র আয়াতের তাফসীর]।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পড়ার জন্য উম্মাতের প্রতি তাঁর নির্দেশ ও পদ্ধতি:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উম্মাতকে দরূদ পড়ার ব্যাপারে অনেক জায়গায় নির্দেশ প্রদান করেছেনএ ব্যাপারে মুতাওতির হাদীস বর্ণিত হয়েছেতার মধ্যে অন্যতম হলো কাব বিন উজরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: বলা হলো হে আল্লাহ তাআলার রাসূল! আপনাকে কিভাবে সালাম দেব তা জানতে পারলামকিন্তু সালাত কিভাবে পড়ব? তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দরূদে ইবরাহীমের কথা বললেন[সহীহ বুখারী হা: ৪৭৯৭]।

এছাড়াও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাতে শব্দের একটু ভিন্নতা পাওয়া যায়তবে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করার উত্তম শব্দ ও দরূদ হলো দরূদে ইবরাহীমতবে আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু কিছু দরূদ পাওয়া যায় যেমন :
يا نبي سلام عليك يا حبيب سلام عليك
এগুলোর কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনা নেইএগুলো একশ্রেণির নামধারী তথাকথিত আলেম নামক ধর্মব্যবসায়ীদের তৈরি করা কথাতাই চার রাকাতবিশিষ্ট সালাতের উভয় বৈঠকে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা ওয়াজিবআবার কেউ সুন্নাত বলেছেন[ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর]।

তাছাড়া আযান শেষে, মসজিদে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার পূর্বে, জানাযার সালাতে, ঈদের সালাতে, আল্লাহ তাআলার কাছে কিছু চেয়ে দুআ করার শেষে ও কবর যিয়ারতের সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব। [ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর]।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করার পদ্ধতি:
পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা যায় এবং সে দরূদ আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে পৌঁছে দেনযেমন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন ; তোমরা আমার কবরকে অনুষ্ঠানের জায়গা বানিয়ে নিও না এবং তোমাদের বাড়ি ঘরকে কবর বানিয়ে নিও না, আর তোমরা আমার প্রতি দরূদ প্রেরণ করতোমরা যেখান থেকেই আমার প্রতি দরূদ পাঠ কর তা আমার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়[আবূ দাঊদ হা: ২০৪২, সনদ সহীহ]।

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: জমিনে আল্লাহ তাআলার কতগুলো ভ্রাম্যমান ফেরেশতা রয়েছে, তারা আমার উম্মাতের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেয়[আহমাদ ১/৪৪১, নাসায়ী হা: ১২৮১, সনদ সহীহ]।

অতএব নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সালাম ও তাঁর প্রতি দরূদ প্রেরণের জন্য পাখি হয়ে মদীনাতে যেতে হবে না এবং কোন হাজী সাহেবকেও বলে দিতে হবে না যে, আমার সালাম নাবীর রওজায় পৌঁছে দেবেনবরং পৃথিবীর যেখান থেকেই দরূদ পাঠ করা হোক না কেন তা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে পৌঁছে যাবে

নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করার ফযীলত ও না পাঠ করলে অপরাধ:
নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে আল্লাহ তাআলা তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন[সহীহ মুসলিম ১/৩০৬, আবূ দাঊদ হা: ১৫৩০]।

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেন: ঐ ব্যক্তির নাক ধূলোয় ধূসরিত হোক, যে ব্যক্তির নিকট আমার নাম উচ্চারণ করা হলো কিন্তু আমার প্রতি দরূদ পাঠ করল নারাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
الْبَخِيلُ مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ، ثُمَّ لَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ
সে ব্যক্তি কৃপণ যার কাছে আমার নাম উচ্চারণ করা হলে দরূদ পাঠ করে না[মুসনাদ আহমাদ হা: ১৭৩৬, সহীহ]।

সুতরাং যে কোন আমল সুন্নাতী তরীকায় আদায় করলে তার নেকীর আশা করা যায়, অন্যথায় তার কোন নেকী পাওয়ার আশা করা যায় না বরং পাপের ভাগী হতে হবে

৫. আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
ক. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর দরূদ পাঠ করার ফযীলত সম্পর্কে জানা গেল
খ. স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এবং ফেরেশতারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর দরূদ পাঠ করেন
গ. যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর দরূদ পাঠ করে না সে হল বড় কৃপণ
ঘ. সুন্নাতী দরূদ পাঠ করতে হবে, কোন প্রকার বিদআতী দরূপ পাঠ করা যাবে না

৬. রাসূল (সাঃ)-এর সম্মানে কাসীদা (কবিতা) :
قَصِيْدَةُ فِيْ مَدْحِ رَسُوْلِ اللهِ صَلّٰى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রসংশায় আরবি কবিতা
 مُحَمَّدٌ سَيِّدُ الْكَوْنَيْنِ وَالثَّقَلَيْنِ # وَالْفَرِيْقَيْنِ مِنْ عَرَبٍ وَمِنْ عَجَمِ
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, দু’জাহানের মহান নেতা
আরব-আজম অধিপতি, বিশ্বগুরু জগত জেতা।
هُوَ الْحَبِيْبُ الَّذِيْ تُرْجٰى شَفَاعَتُهُ # لِكُلِّ هَوْلٍ مِّنَ الْأَهْوَالِ مُقْتَحِمِ
প্রিয় সখা খোদ এলাহির, পরকালের কান্ডারী সে
কঠোর কঠিন বিপদকালে, মুক্তি দয়ার ভান্ডারী সে।
بُشْرٰى لَنَا مَعْشَرَ الإِسْلَامِ إِنَّ لَنَا # مِنَ الْعِنَايَةِ رُكْنًا غَيْرَ مُنْهَدَمِ
ভাগ্য দারাজ এ মিল্লাতের, আল্লাহর প্রিয় রাসূল আল-আমীন
করলো কায়েম এমন খুঁটি, ধ্বংস যাহার নেই কোনো দিন। [তথ্যসূত্র : কাসীদা-ই বুরদা]।

০৭. উপসংহারঃ
রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি দুরূদ ও সালাত পাঠের মাধ্যমে সম্মান বৃদ্ধি, গুণাহ মাফসহ আরো অন্যান্য উপকারিতা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে সদা-সর্বদা সচেষ্ট হতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন, আমীন।