বিসমিল্লাহির রাহমানির
রাহীম
فــــــضـــــــائـــــل
العــــــشــــــر مـــــــن ذي الحــــــجــــــــة
যিলহজ্জের প্রথম দশকের ফযীলত (তাৎপর্য, মাহাত্ম, গুরুত্ব) ও করণীয়
আব্দুস সালাম হুসাইন আলী
১. ভূমিকাঃ
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু
তা‘আলার জন্য যিনি, আমাদের জন্য ইসলাম ধর্মকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন এবং যিলহজ্জের প্রথম
দশকের বিশেষ বিশেষণ ভূষিত করেছেন। দুরূদ, সালাম ও
শান্তির অবিরাম ধারা বর্ষিত হউক নবীকূল শিরোমণি মুহাম্মদ (সা) এর প্রতি
যিনি, যিলহজ্জের প্রথম দশকের ‘আমলের বিশেষ পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।
সালাম ও শান্তি বর্ষিত হউক রাসূল (সা)-এর পবিত্র বংশধর ও সম্মানিত
সাথীদেরসহ সকল মুসলিমের প্রতিও।
২. জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের ফযীলতঃ
ক. আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা
এরশাদ করেছেন : ﴿وَالْفَجْرِ ○ وَلَيَالٍ عَشْرٍ﴾ ‘সপথ ফজরের এবং সপথ দশ রজনীর’। [সূরা ফাজর : ১-২]। আল্লামা
ইবনে কাছীর (রহ) বলেন : দশ রজনী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ রজনী। [তাফসীর ইবনে কাছীর]।
খ. অনুরূপভাবে আল্লাহ
সুবহানাহু তা‘আলা এরশাদ করেছেন : ﴿وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ﴾ ‘আর
নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করুন’। [সূরা হাজ্জ :
২৮]। ইবনু
আব্বাস (রা) বলেন : ‘নির্দিষ্ট দিন’
বলতে জিলহজ্জের প্রথম দশককে বুঝানো
হয়েছে। [দুরুসু ‘আশারা জিলহিজ্জা, আব্দুল মালেক আল-ক্বাসিম]।
গ. ইবনু ‘আববাস (রাযি.)
হতে বর্ণিত। রাসূল (সা) এরশাদ করেছেন :
مَا الْعَمَلُ فِي أَيَّامٍ أَفْضَلَ مِنْهَا فِي هَذِهِ قَالُوا وَلاَ الْجِهَادُ قَالَ وَلاَ الْجِهَادُ إِلاَّ رَجُلٌ خَرَجَ يُخَاطِرُ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ بِشَيْءٍ যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের ‘আমালের চেয়ে অন্য কোন দিনের ‘আমালই উত্তম নয়। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জিহাদও নয়। তবে সে
ব্যক্তির কথা ছাড়া যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়েও জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে
ফিরে আসে না। [সহীহ
বুখারী ৯১৮ (ই. ফা), ৯১৩ (আ. প্র), ৯৬৯ (তা. পা)]।
ঘ. রাসূল (সা) বলেন : أَعْمَارُ أُمَّتِيْ مَا بَيْنَ السِّتِيْنَ إِلَى السَّبْعِيْنَ “আমার উম্মতের বয়স ষাট থেকে সত্তর বছরের মাঝখানে” [তিরমিজী]। অন্যান্য
নবীর উম্মতদের তুলনায় উম্মতে মুহাম্মাদীর বয়স যদিও কম কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল
আলামীন তাদেরকে এমন কিছু মূল্যবান সময় দান করেছেন যাতে অল্প সময়ে অল্প আমল করেও
আল্লাহর কাছে অতীতের উম্মতগুলির চেয়ে অধিক প্রিয় বলে গণ্য হতে পারবে। আল্লাহ তায়ালা উম্মতে মুহাম্মাদীকে যে সমস্ত ফজীলতপূর্ণ সময়
দান করেছেন, তার মধ্যে যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন অন্যতম।
তাই প্রতিটি মুসলিম
ব্যক্তির উচিৎ উক্ত দশটি দিনের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার সৎ ‘আমল বেশী করে সম্পাদন করার মাধ্যমে এই মহান ফযীলত
অর্জন করে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সচেষ্ট হওয়া। এই প্রবন্ধে যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের কতিপয় ফযীলতপূর্ণ ‘আমলের বর্ণনা করব ইনশা-আল্লাহ।
৩. যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে যে
সকল সৎকর্ম (‘আমল) সমূহ সম্পাদন করা যায়। যথা :
৩/১. أداء الصلاة সালাত আদায় করাঃ
ফরয ও নফল সালাত আদায় করা। রাসূল (সা) বলেছেন : عَلَيْكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ لِلَّهِ فَإِنَّكَ لاَ تَسْجُدُ لِلَّهِ سَجْدَةً إِلاَّ رَفَعَكَ اللَّهُ بِهَا دَرَجَةً وَحَطَّ عَنْكَ بِهَا خَطِيئَةً তুমি সাজদাহ করো। কেননা তুমি যখনই আল্লাহর জন্য একটি সাজদাহ
করবে, আল্লাহ তার বিনিময়ে তোমার মর্যাদা একধাপ সমুন্নত করবেন এবং তোমার একটি গুনাহ
মাফ করবেন’। [মুসলিম ৪৮৮, ইবনে মাযাহ ১৪২২]।
৩/২. ﺍﻟﺤﺞ
ﻭﺍﻟﻌﻤﺮﺓ হজ্জ ও উমরা পালন করাঃ
হজ্জ ইসলামের পঞ্চম রোকন। সামর্থবান ব্যক্তির উপর ইহা জীবনে একবার আদায় করা ফরয। হজ্জের ফযীলতে অনেক সহীহ হাদীস বর্ণিত
হয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন, مَنْ
حَجَّ للهِ
فَلَمْ يَرْفُثْ
وَلَمْ يَفْسُقْ
رَجَعَ كَيَوْمِ
وَلَدَتْهُ أُمُّهُ “যে ব্যক্তি হজ্জ করল,
এবং হজ্জ করা অবস্থায় কোন পাপের কাজে লিপ্ত হয়নি, সে এমন
নিষ্পাপ অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করল, যেমন নিষ্পাপ অবস্থায় মায়ের পেট
থেকে জন্ম গ্রহণ করেছিল”। [সহীহ বুখারী ১৫২১, সহীহ
মুসলিম ২৮৮৯]।
আবু হুরায়রা (রা) হতে
বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন
: الْعُمْرَةُ إِلَى
الْعُمْرَةِ كَفَّارَةٌ
لِمَا بَيْنَهُمَا،
وَالْحَجُّ الْمَبْرُورُ
لَيْسَ لَهُ
جَزَاءٌ إِلاَّ
الْجَنَّةُ “এক উমরা
থেকে অপর উমরা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কৃত অপরাধ সমূহ উমরার মাধ্যমে ক্ষমা করে দেওয়া
হয়। আর মকবুল হজ্জের পুরস্কার আল্লাহর
কাছে জান্নাত ছাড়া অন্য কিছু নয়। [সহীহ বুখারী ১৭৭৩, সহীহ মুসলিম ১৬৫৫ ই. ফা]।
৩/৩. الصيام সাওম / সিয়াম পালন করাঃ
‘আমালে সালেহার নিয়তে বেশি করে নফল
সাওম পালন করা। রাসূল (সা)-এর কতেক স্ত্রীগণ থেকে
বর্ণিত : كَانَ رَسُولُ
اللهِ صَلَّى
اللهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ يَصُومُ
تِسْعَ ذِي
الْحِجَّةِ وَيَوْمَ
عَاشُورَاءَ وَثَلاَثَةَ
أَيَّامٍ مِنْ
كُلِّ شَهْرٍ ‘রাসূল (সা) যিলহজ্জের নবম দিন, আশুরার দিন এবং প্রত্যেক মাসে তিন
দিন সাওম পালন করতেন’। ইমাম নাবাবী (রহ) যিলহজ্জের দশদিনের সাওম
সম্পর্কে বলেন : এই দিনগুলোতে সাওম পালন করা মুস্তাহাব। [আহমাদ, আবু দাউদ ২৪৩৭, নাসাঈ ২৪১৭]।
৩/৪. صيام
يوم العرفة আরাফার সাওম পালন করাঃ
রাসূল (সা) বলেছেন, “এই
দিনগুলোতে রোযা পালন করা মুস্তাহাব। বিশেষ
করে যে ব্যক্তি হজ্জে যায়নি, তার জন্য আরাফার দিন অর্থাৎ যিলহজ্জ
মাসের ৯ তারিখে (হজ্জ পালনকারীগণ ব্যাতীত) সাওম রাখা
মুস্তাহাব”। আবু কাতাদাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেছেন : صِيَامُ
يَوْمِ عَرَفَةَ
أَحْتَسِبُ عَلَى
اللَّهِ أَنْ
يُكَفِّرَ السَّنَةَ
الَّتِي قَبْلَهُ
وَالسَّنَةَ الَّتِي
بَعْدَهُ ‘আরাফার
দিবসের রোযা বিগত এবং আগত এক বছরের গুনাহ মোচন করে দেয়’। [সহীহ বুখারী ৫০৫২, সহীহ মুসলিম ১১৬২]। তবে যিনি হজ্জ করতে গিয়ে আরাফার মাঠে অবস্থান
করছেন, তার জন্য রোজা রাখা বৈধ নয়।
৩/৫. ﺍﻹﻛﺜﺎﺭ
ﻣﻦ ﺍﻟﺘﻜﺒﻴﺮ বেশী বেশী তাকবীর বলাঃ
৩/৫/ক. তাকবীরের গুরুত্ব
:
যিলহজ্জ মাসের চাঁদ
উঠার পর থেকেই উঁচু আওয়াজে বেশী বেশী তাকবীর পাঠ করা সুন্নত। ফরয নামাযের পর, মসজিদে, বাজারে
এবং রাস্তায় চলার সময় এ তাকবীর বেশী করে পাঠ করা। মহিলাগণ নিচু আওয়াজে তাকবীর পাঠ করবে। তবে
দলবদ্ধভাবে সমস্বরে তাকবীর পাঠ করা সুন্নতের পরিপন্থী। কারণ সাহবাদের থেকে দলবদ্ধভাবে তাকবীর পাঠ করার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না। অথচ তারা ছিলেন সৎকাজে আমাদের চেয়ে অনেক অগ্রগামী।
৩/৫/খ. তাকবীর পাঠের মূল ভিত্তি বা বিধিবদ্ধের প্রমাণ :
e আল্লাহ
সুবহানাহু তা‘আলা এরশাদ করেছেন : ﴿وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ﴾ ‘আর
নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করুন’। [সূরা হাজ্জ :
২৮]।
e ইবনু
আব্বাস (রা) বলেন : ‘নির্দিষ্ট দিন’
বলতে জিলহজ্জের প্রথম দশককে বুঝানো
হয়েছে। [দুরুসু ‘আশারা জিলহিজ্জা, আব্দুল মালেক আল-ক্বাসিম]।
e রাসূল (সা) বলেছেন : أَيَّامُ اَلتَّشْرِيقِ
أَيَّامُ أَكْلٍ
وَشُرْبٍ، وَذِكْرٍ
للهِ عَزَّ
وَجَلَّ ‘আইয়্যামুত তাশরিক’ (তাকবীর পাঠ করার
নির্ধারিত দিনগুলো) হলো : খাওয়া ও পান করা এবং আল্লাহ
সুবহানাহু তা‘আলার যিকির (স্মরণ) করা’। [সহীহ মুসলিম
১১৪১, আবু দাউদ ২৪১৯, তিরমিযী ৭৭৩]।
৩/৫/গ. তাকবীরের প্রকারভেদ। তাকবীর দু‘ ধরণের :
ð অনির্দিষ্ট তাকবীর
: সময় ও স্থান নির্ধারণ না করে বাড়ী, মসজিদ, রাস্তা ও
বাজারে উঁচু আওয়াজে তাকবীর পাঠ করা। জিলহজ্জের
প্রথম দিন থেকে ঈদের দিন পর্যন্ত এ তাকবীর চলতে থাকবে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন,
ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা (রা) এই দিন গুলোতে তাকবীর বলতে
বলতে বাজারে যেতেন। তাদেরকে তাকবীর বলতে শুনে লোকেরাও
তাকবীর পাঠ করত।
وَكَانَ
عُمَرُ يُكَبِّرُ فِي
قُبَّتِهِ
بِمِنًى
فَيَسْمَعُهُ
أَهْلُ الْمَسْجِدِ فَيُكَبِّرُونَ وَيُكَبِّرُ أَهْلُ
الْأَسْوَاقِ
حَتَّى تَرْتَجَّ مِنًى
تَكْبِيرًا
وَكَانَ
ابْنُ عُمَرَ يُكَبِّرُ
بِمِنًى
تِلْكَ الْأَيَّامَ وَخَلْفَ
الصَّلَوَاتِ
وَعَلَى
فِرَاشِهِ
وَفِي فُسْطَاطِهِ وَمَجْلِسِهِ وَمَمْشَاهُ تِلْكَ
الْأَيَّامَ
جَمِيعًا
وَكَانَتْ
مَيْمُونَةُ
تُكَبِّرُ
يَوْمَ النَّحْرِ وَكُنَّ
النِّسَاءُ
يُكَبِّرْنَ
خَلْفَ أَبَانَ بْنِ
عُثْمَانَ
وَعُمَرَ
بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ
لَيَالِيَ
التَّشْرِيقِ
مَعَ الرِّجَالِ فِي
الْمَسْجِدِ
‘উমার (রাযি.) মিনায় নিজের তাবূতে তাকবীর বলতেন। মসজিদের লোকেরা তা শুনে তারাও তাকবীর বলতেন এবং বাজারের লোকেরাও তাকবীর বলতেন। ফলে সমস্ত মিনা তাকবীরে আওয়াযে গুঞ্জরিত হয়ে উঠত। ইবনু
‘উমার (রাযি.)
সে দিনগুলোতে মিনায় তাক্বীর বলতেন এবং সালাতের পরে, বিছানায়, খীমায়, মজলিসে এবং চলার সময় এ দিনগুলোতে তাক্বীর
বলতেন। মাইমূনাহ (রাযি.) কুরবানীর দিন তাক্বীর বলতেন এবং মহিলারা
আবান ইবনু ‘উসমান
ও ‘উমার ইবনু ‘আবদুল ‘আযীয (রহ.)-এর পিছনে তাশরীকের রাতগুলোতে
মসজিদে পুরুষদের সঙ্গে সঙ্গে তাকবীর বলতেন। [সহীঞ বুখারী ৯৭০]।
ð নির্দিষ্ট তাকবীর : অর্থাৎ
নির্দিষ্টভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পর তাকবীর পাঠ করা। এই তাকবীর জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ ফজরের নামাযের পর থেকে শুরু করে আইয়ামে
তাশরীক তথা জিলহজ্জ মাসের ১৩ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলতে থাকবে। [তাফসীর ত্ববারী, কুরতুবী, তাফসীর ইবনু কাছীর ১/৫৬১]।
৩/৫/গ. তাকবীরের শব্দ চয়নে ভিন্নতা রয়েছে তথাপি সর্বাধিক পঠিতব্য তাকভীর হলো
নিম্নোক্ত তাকবীর : اَللهُ أَكْبَرْ، اَللهُ أَكْبَرْ، لَا إلٰهَ إلَّا اللهُ، واللهُ أَكْبَرْ، اَللهُ أَكْبَرْ، وَللهِ الْحَمْدْ (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু
আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু,
ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ)।
@ আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা)-এর আছার (কর্ম) :
كَانَ عَبْدُ اللهِ ابْنِ مَسْعُوْدٍ يُكَبِّرُ مِنْ
صَلاَةِ الْفَجْرِ يَوْمَ عَرَفَةَ إِلَى صَلاَةِ الْعَصْرِ مِنَ يوم النَّحْرِ، يَقُولُ : اَللهُ أَكْبَرْ، اَللهُ أَكْبَرْ، لَا إلٰهَ إلَّا اللهُ، واللهُ أَكْبَرْ، اَللهُ أَكْبَرْ، وَللهِ الْحَمْدْ
আব্দুল্লাহ
ইবনু মাসউদ (রা) আরাফার দিন (সৌউদীর হিসাব অনুযায়ী) ফযরের সালাত থেকে কুরবানীর
দিনগুলির শেষ দিন আসর পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন এবং বলতেন : আল্লাহ মহান, আল্লাহ
মহান, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, আর আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আর তার জন্যই সকল
প্রশংসা। [সনদ নির্ভরযোগ্য ; মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবা ৫৬৩২]।
@ আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রা)-এর আছার (কর্ম) :
أَنَّهُ كَانَ ابن عباس رضي الله عنهما يُكَبِّرُ مِنْ صَلاَةِ الْفَجْرِ يَوْمَ عَرَفَةَ إِلَى آخِرِ أَيَّامِ التَّشْرِيقِ، لاَ يُكَبِّرُ فِي الْمَغْرِبِ : اَللهُ أَكْبَرْ، اَللهُ أَكْبَرْ، لَا إلٰهَ إلَّا اللهُ، واللهُ أَكْبَرْ، اَللهُ أَكْبَرْ، وَللهِ الْحَمْدْ
আব্দুল্লাহ
ইবনু ‘আব্বাস (রা) আরাফার দিন (সৌউদীর হিসাব অনুযায়ী) ফযরের সালাত থেকে তাকবীর
পাঠের দিনগুলির শেষ দিন পর্যন্ত মাগরিবের সালাত ব্যতীত তাকবীর পাঠ করতেন এবং বলতেন
: আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, আর আল্লাহ মহান, আল্লাহ
মহান, আর তার জন্যই সকল প্রশংসা। [সনদ : সহীহ ; মুসান্নাফ
ইবনু আবি শাইবা ৫৬৪৫, ৫৬৫৪]।
৩/৫/ঘ. তাকবীরের হিকমাহ (গূঢ়রহস্য) :
@ শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ্ (রাহি) বলেন
:
ð মানুষরূপী, জ্বিনরূপী ও অগ্নীয় শয়ত্বান প্রতিরোধ করার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু
তা‘আলা ‘তাকবীর পাঠ করা বিধিবদ্ধ করেছেন।
ð আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলার মহানূবভতা এবং মুসলিম ব্যক্তির অন্তরে ঈমানী
শক্তি বৃদ্ধির জন্যও ‘তাকবীর’ বিধিবদ্ধ করেছেন।
ð আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলার জন্যই সকল ভূয়ুশী প্রশংসা ও গৌরবত্ব এই প্রতিপাদ্য বিষয়ক শ্লোগান সিহেবে বিধিবদ্ধ করেছেন।
ð দ্বীন একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলার জন্য এবং বান্দার সকল দাসত্ব
ও ঈবাদ পাওয়ার যোগ্য কেবরমাত্র তিনিই এই বিষয়ের সুস্পষ্ঠতার জন্যই ‘তাকবীর’ বিধিবদ্ধ
করেছেন।
ð আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা অমুখাপেক্ষী আর বান্দাগণ ‘ইলাহ’-এর নিকট মুখাপেক্ষী
তার ঘোষণা হিসেবে ‘তাকবীর’ বিধিবদ্ধ করেছেন।
ð সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করা এবং আনুগত্য করতে হবে সার্বভৌমত্তের একমাত্র
স্বত্তাধিকারী আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলার এই স্বীকৃতি অন্তরে পোষণ করার জন্যই ‘তাকবীর’
বিধিবদ্ধ করেছেন। [মাজমু‘উল ফাতাওয়া ২৪/২২৯ ও ২৩০]।
@ হাফিজ ইবনু হাজার আসক্বালানী
(রহ) বলেন : ‘তাকবীর’ বান্দার প্রতিটি কর্মের পতিক্রিয়া প্রকাশ করতে সাহায্য
করে ; মহান আল্লাহর নি‘আমতরাজির কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপক এবং পাপ-পঙ্কিলতামুক্ততার জন্য বিশেষত
ইয়াহুদী কর্তৃক আরোপিত সকল কূট মন্তব্যের অবসান ঘটানোর জন্য ‘তাকবীর’ বিধিবদ্ধ
করেছেন। [ফাতহুল বারী ২/৪৩৮]।
৩/৬. الأضحية উযহিয়্যাহ বা কুরবানী বরাঃ
সামর্থবান ব্যক্তির উপর
কুরবানী করা সুন্নাতে মুআক্কাদা তথা ওয়াজিব। কুরবানী দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এমন ব্যক্তির জন্য কুরবানী না দেওয়া মাকরূহ। অনেক আলেম আল্লাহর বাণী : ﻓﺼﻞ ﻟﺮﺑﻚ ﻭﺍﻧﺤﺮ “আপনার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন।” এই আয়াতকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করে কুরবানী দেওয়াকে ওয়াজিব বলেছেন। ইবনে উমর (রা) বলেন, রাসূল (সা) মদীনাতে দশ বছর
অবস্থান করেছেন। তিনি প্রতি বছরই কুরবানী করেছেন [তিরমিজী, আহমদ]। কুরবানী নিজ হাতে করা উত্তম। নিজে করতে না পারলে অন্যকে দিয়ে করা যেতে পারে। কুরবানী জবাই করার সময় ‘বিসমিল্লাহ
আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করবে। জবাই করার সময় কুরবানী আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার দু‘আ করা
মুস্তাহাব।
৩/৭. برالوالدين পিতা-মাতার সেব-যত্ন ও
আনুগত্য করাঃ
ক. এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা
এরশাদ করেছেন :
﴿وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا
تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ
عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا
تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا {23} وَاخْفِضْ لَهُمَا
جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي
صَغِيرًالآ {24}﴾
‘তোমাদের প্রতিপালক
নির্দেশ দিয়েছেন যে,
তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার
প্রতি সদ্ব্যবহার করবে;
তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপণীত
হলেও তাদেরকে বিরক্তি সূচক কিছু বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিওনা; তাদের
সাথে বলো সম্মান সূচক নম্র কথা। (২৪) অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বলো : হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের
উভয়ের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।’ [সূরা বানী ইসরাঈল : ২৩
- ২৪]।
খ. আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা
বলেছেন : ﴿وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئاً وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا﴾ ‘তোমরা
ইবাদত কর আল্লাহর,
তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে। [সূরা নিসা : ৩৬]।
গ. আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা বলেছেন :
﴿وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْناً عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ . وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ﴾
‘আর আমি মানুষকে তার মাতাপিতার
ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা
কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই। আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শির্ক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে
তোমার কোন জ্ঞান নেই,
তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস
করবে সদ্ভাবে। আর অনুসরণ কর তার পথ, যে আমার
অভিমুখী হয়। তারপর আমার কাছেই তোমাদের
প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, যা তোমরা
করতে’। [সূরা লুকমান :
১৪-১৫]।
ঘ. বুখারী ও মুসলিমে আব্দুল্লাহ
বিন মাসউদ (রা) হতে বর্ণিত,
রাসূল (সা) বলেছেন :
سَأَلْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ أَيُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ؟ قَالَ: الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا، قَالَ: ثُمَّ أَيٌّ؟ قَالَ: ثُمَّ بِرُّ الْوَالِدَيْنِ، قَالَ: ثُمَّ أَيٌّ؟ قَالَ: الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ‘আমি রাসুল (সা) কে জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহর
নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বললেন, ‘সময়মতো নামায আদায় করা’। আমি বললাম, এরপর? তিনি বললেন,
‘পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার’। আমি
বললাম, এরপর? তিনি বললেন,
‘আল্লাহর পথে জিহাদ করা’ [বুখারী ৫৯৭০]।
ঙ. আব্দুল্লাহ বিন আমর
(রা) হতে অপর এক বর্ণনায় রাসূল (সা) বলেছেন : رِضَى الرَّبِّ فِيْ رِضَى الْوَالِدِ، وَسَخَطِ الرَّبِّ فِيْ سَخَطِ الْوَالِد ‘পিতার সন্তুষ্টিতে রবের সন্তুষ্টি। আর পিতার অসন্তুষ্টিতে রবের অসন্তুষ্টি’ [তিরমিযী ১৮৯৯, সহীহ]।
চ. ইবনে উমর (রা) বলেন, রাসূল
(সা) বলেছেন : ثَلَاثَةٌ لَا يَنْظُرُ اللهُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: الْعَاقُّ لِوَالِدَيْهِ وَمُدْمِنُ الْخَمْرِ وَالْمَنَّانُ ‘তিন ব্যক্তির দিকে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা
তাকাবেন না। (ক) পিতা-মাতার অবাধ্য (খ) মদ
পানকারী (গ) দান করে খোঁটাদাতা’ [সুনান নাসায়ী ২৫৬২]।
ছ. পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া
অনেক বড় গোনাহ। আল্লাহর সাথে শিরকের পরই এর
অবস্থান। আবু বাকরা (রা) বলেন, রাসুল
(সা) বলেছেন : أَلَا أُنَبِئُكُمْ بِأكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟ قَالَهَا ثَلَاثاً، قُلْنَا : بَلَى يَا رَسُوْلُ اللهِ، قَالَ : الإِشْرَاكُ باللهِ وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ ‘আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় গোনাহ কোনটি তা বলব না? তিনি তিন
বার বললেন। আমরা বললাম, হাঁ,অবশ্যই
ইয়া রাসূলুল্লাহ,
আমাদের বলুন : তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং
পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়া’
[বুখারী ৫৯৭৬ মুসলিম
৮৭]।
৩/৮. أداء
حقوق الأرحام আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা করাঃ
৩/৮/ক. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব
ও তাৎপর্য :
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায়
রাখার দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা মানুষের রিজিক বাড়িয়ে দেন, হায়াত দীর্ঘ করেন, এবং
মানুষের ধন-সম্পদে বরকত দেন। আত্মীয়তার
সম্পর্ক বলতে বুঝানো হয়,
পিতা-মাতা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে এবং এসবের উর্ধ্বতন ও নিম্নতন আত্মীয়-স্বজনকে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা
করা যেমন জরুরী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা তেমনি হারাম। আর আত্মীয়-স্বজনদের ভালো-মন্দের খোঁজ-খবর রাখা, বিপদাপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং
তাদের সার্বিক কল্যাণ কামনা করার ফযীলত সম্পর্কে কুরআনে কারিমে এবং হাদীসে অনেক
বাণী উল্লিখিত হয়েছে।
৩/৮/খ. আত্মীয়তার
সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে কুরআনের বাণী :
➤ আল্লাহ যে সম্পর্ক অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যারা তা অটুট রাখে তাদের প্রশংসায়
তিনি ইরশাদ করেন : ﴿وَالَّذِينَ يَصِلُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُونَ سُوءَ الْحِسَابِ﴾ ‘আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যারা তা
অটুট রাখে এবং তাদের রবকে ভয় করে, আর মন্দ হিসাবের আশঙ্কা করে।’ [সূরা আর-রা‘দ : ২১]।
➤ পক্ষান্তরে যারা এ সম্পর্ক অটুট রাখে না তীব্র ভাষায় তাদের ভৎর্সনা করে আল্লাহ
তা‘আলা বলেন : ﴿وَالَّذِينَ يَنْقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ﴾ ‘আর যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যে
সম্পর্ক অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের
জন্যই লা‘নত আর তাদের জন্যই রয়েছ আখিরাতের মন্দ আবাস।’ [সূরা আর-রা‘দ : ২৫]।
➤ যারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে
না তাদের ধমক দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন : ﴿فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ ○ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ﴾ ‘তবে কি
তোমরা প্রত্যাশা করছ যে,
যদি তোমরা শাসন কর্তৃত্ব পাও, তবে তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি
করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরাই যাদেরকে আল্লাহ লানত করেন, তাদেরকে
বধির করেন এবং তাদের দৃষ্টিসমূহকে অন্ধ করেন।’ [সূরা মুহাম্মদ : ২২-২৩]।
➤ রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচারের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন
: ﴿وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا﴾ ‘আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চাও। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক।’ [সূরা আন-নিসা : ০১]।
এসব আয়াত থেকে আমরা
সুস্পষ্ট বুঝতে পারি যে,
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখার নির্দেশ
দিয়েছেন এবং এ সম্পর্ক ক্ষুন্ন করতে নিষেধ করেছেন।
সম্মানিত পাঠকবর্গ, আমরা কি
আল্লাহর বাণীর মর্ম অনুধাবন করেছি? আমরা কি রাব্বুল আলামিনের ডাকেন
সাড়া দেব না? নাকি এরপরও আমরা আত্মীয়-পরিজনদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখবো? নিজেদের
গোমরাহিতে ডুবে থাকবো?
আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতার পুনরাবৃত্তি করতে থাকবো? আর
রাব্বুল আলামিনের নির্দেশ পালনে উদাসীন থাকবো?
৩/৮/গ. আত্মীয়তার
সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে হাদীসের বাণীঃ
➤ আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল
(সা) এরশাদ করেছেন : إِنَّ اللهَ خَلَقَ الْخَلْقَ حَتَّى إِذَا فَرَغَ مِنْ خَلْقِهِ قَالَتِ الرَّحِمُ هَذَا مَقَامُ الْعَائِذِ بِكَ مِنَ الْقَطِيعَةِ قَالَ نَعَمْ أَمَا تَرْضَيْنَ أَنْ أَصِلَ مَنْ وَصَلَكِ وَأَقْطَعَ مَنْ قَطَعَكِ قَالَتْ بَلَى يَا رَبِّ قَالَ فَهُوَ لَكِ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاقْرَءُوا إِنْ شِئْتُمْ ﴿فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ﴾ আল্লাহ
তা‘আলা সৃষ্টি জীবের সৃজন কাজ শুরু করেন। যখন তিনি
এ কাজ সমাপ্ত করেন,
আত্মীয়তা-সম্পর্ক বলে উঠল, ‘এটি আপনার কাছে আত্মীয়তা-সম্পর্ক
ছিন্নকারীর আশ্রয়স্থান’। আল্লাহ তা‘আলা বললেন, ‘হ্যা, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও, যে তোমাকে জুড়ে রাখবে আমিও তার
সঙ্গে জুড়ে থাকবো আর যে তোমাকে ছিন্ন করবে আমিও তাকে ছিন্ন করবো?’ আত্মীয়তা-সম্পর্ক
বলল, ‘জি হ্যা, হে আমার রব’। তিনি বললেন, ‘এটা শুধু তোমার জন্য’। রাসূল (সা) বলেন,
তোমরা চাইলে এ আয়াত পড়ে দেখ : ﴿فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ﴾ ‘তবে কি তোমরা প্রত্যাশা করছ যে, যদি তোমরা শাসন কর্তৃত্ব পাও, তবে
তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে?’। [সূরা মুহাম্মদ : ২২} সহীহ বুখারী হা/নং ৫৯৮৭]।
➤ আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল
(সা) এরশাদ করেছেন : إنَّ الرَّحِمَ مُعَلَّقَةٌ بِالْعَرْشِ تُنَادِي بِلِسَانٍ لَهَا ذُلَقٍ : اللَّهُمَّ صِلْ مَنْ وَصَلَنِي، وَاقْطَعْ مَنْ قَطَعَنِي ‘নিশ্চয় আত্মীয়তা-সম্পর্ক আরশকে আকঁড়ে ধরা একটি কা-, যা
জিহ্বার ডগা দিয়ে বলে,
‘হে আল্লাহ, তুমি তার সাথে জুড়ো যে আমার সাথে জুড়ে আর তুমি তাকে ছিন্ন
করো যে আমাকে ছিন্ন করে।’ তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়াতা‘আলা বলেন, ‘রহীম রহমান
(আমি দয়ালু, পরম করুণাময়) আর ‘রাহীম’ (اَلرَّحِمَ) তথা আত্মীয়তা-সম্পর্ক শব্দটিকে আমার নাম থেকে বের করেছি। সুতরাং যে এর সাথে সুসম্পর্ক রাখবে আমি তার সাথে সুম্পর্ক
রাখবো আর যে এ সম্পর্ক ভঙ্গ করবে আমি তার সাথে সম্পর্ক ভঙ্গ করবো’। [মুসান্নফ ইবনু আব্দির
রাজজাক হা/নং ২৫৯০১]।
➤ আবু সুফিয়ান (রা) ইসলাম গ্রহণের আগে বাণিজ্য সফরে শাম দেশে গেলে বাদশা হেরাকল
তাঁর কাছে রাসূল (সা)-এর বিবরণ জানতে চান। জবাবে
তিনি রাসূল (সা)-এর বিবরণ তুলে ধরেন এভাবে : يَأْمُرُنَا بِالصَّلاَةِ وَالصَّدَقَةِ وَالْعَفَافِ وَالصِّلَةِ ‘তিনি আমাদের আল্লাহর ইবাদত, সালাত, সত্যবাদিতা, চারিত্রিক
শুভ্রতা ও আত্মীয়তা-সম্পর্ক বজায় রাখার আদেশ করেন।’ [সহীহ বুখারী হা/নং ৫৯৮০]।
➤ আমরা কুরআন ও হাদীস থেকে জানতে পারি যে, রাসূল (সা) ইসলামের সূচনাকালে
যেসব বিষয়ের দাওয়াত দিয়েছেন আত্মীয়তা-সম্পর্ক তার মধ্যে অন্যতম। আমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে পারি দু’ভাবে। যথা : (ক) কিছু কাজ করার মাধ্যমে। যেমন : আত্মীয়দের সঙ্গে সদ্ব্যবহার এবং তাদের সঙ্গে সদাচার অব্যাহত রাখা। (খ) কিছু কাজ না করার মাধ্যমে। যেমন : আত্মীয়দের কষ্ট না দেয়া এবং তাদের অনিষ্ট না করা। প্রথমটি আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষার সর্বোচ্চ স্তর আর দ্বিতীয়টি সর্বনিম্ন স্তর।
৪. উপসংহারঃ
আমাদের সকলকে আল্লাহ
সুবহানাহু তা‘আলার সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জনে যিলহজ্জের প্রথম দশকের তাপর্যমন্ডিত
ফযীলত, সাওয়াবপূর্ণ ইবাদত করার তাওফীক্ব দান করুন, আমীন।

No comments:
Post a Comment